চন্দ্রমল্লিকা
সঞ্চিতা
দত্ত
পাহাড়ঘেরা ছোট্ট গ্রাম রাঙ্গামাটি। সবুজে ঘেরা, পাখির কুজনে মুখরিত সেই গ্রামে ছিল রোহিনীর ছোট্ট সংসার। বাবা বিপ্রদাস মুখার্জি, গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। মা মীনাক্ষী, ঘরকুনো শান্ত স্বভাবের এক নারী। ছোট ভাই সুব্রত, যার বয়স তখন আট। রোহিনী ছিল বাবার স্বপ্ন—তাকে বড় করে ডাক্তার বানাবে।
গ্রামের স্কুলে সেরা ছাত্রী রোহিনী। তার চোখে ছিল স্বপ্নের দীপ্তি। বাবা বলতেন, "জগতে মানুষ হবি, শুধু মেয়েমানুষ হবি না।"
কিন্তু জীবন যেমন
গল্পে হাসে, বাস্তবে তেমনি আঘাত হানে।
হঠাৎ একদিন বিপ্রদাস স্ট্রোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। চিকিৎসার খরচ, সংসারের চাপ, মা-মেয়ের চোখে ভয়। গ্রামবাসী সহানুভূতির গল্প বলে, কিন্তু সাহায্য করে না। বাবার মৃত্যুর পর মা ভেঙে পড়েন। রোহিনী স্কুল ছাড়ে।
তখনই আসে মাধব কাকু, দূরসম্পর্কের আত্মীয়। শহরে কাজের প্রস্তাব দেয়। মা সন্দেহ করে, কিন্তু উপায় না দেখে রাজি হয়। রোহিনীকে নিয়ে চলে যায় শহর রাজশাহীতে।
শহর মানেই নতুন সম্ভাবনা ভেবেছিল রোহিনী। কিন্তু মাধব কাকু তাকে বিক্রি করে দেয় দালাল 'ছোট্টা রবি'র হাতে। রোহিনীকে আনা হয় পুরনো লালবাগের পতিতালয়ে।
প্রথম রাতেই বুঝে যায়, তার জীবন আর আগের মতো নেই। আর্তনাদ, বাঁচার আকুতি—সব নিষ্ফল। তার নাম বদলে দেয়া হয়, এখন সে 'চন্দ্রমল্লিকা'। জানালার পাশে যে গাছ, সেটার সৌন্দর্য তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
পতিতালয়ে রোহিনীর সহচরী হয় শিউলি, এক ষোড়শী মেয়ে, যার বাবা তাকে নিজের হাতে বিক্রি করেছিল। শিউলি রোহিনীর জীবনে আলো আনে।
আরো ছিল মৌজু আপা, প্রবীণ পতিতা, যিনি একসময় কবিতা লিখতেন। মৌজু আপা বলেন, "আমরা বেঁচে থাকি শরীরে, মরেও যাই শরীরে। মনের মৃত্যু নেই।"
রোহিনী ঠিক করে নিজেকে হারাবে না। পড়াশোনা শুরু করে, মৌজু আপার সাহায্যে।এক রাতে দালাল 'ছোট্টা রবি' রোহিনীকে বিক্রি করতে চায় এক বিদেশি পার্টিতে। শিউলি বাধা দেয়, মার খায়। রোহিনী বুঝে যায়, পালাতে হবে।
সে এক রাতেই ঘরে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়, শিউলিকে নিয়ে। তারা আশ্রয় নেয় 'মানবধ্বনি' নামের এক এনজিও সংস্থায়, যেটি পতিতাদের পুনর্বাসন করে। সেখানকার কর্মী তানভীর ভাই তাদের বাঁচায়।
রোহিনী ভর্তি হয় শহরের কলেজে। স্নাতক শেষ করে সমাজকর্ম পড়তে শুরু করে। তার মূল লক্ষ্য—পতিতাদের অধিকার নিয়ে লড়া।
এনজিওতে সে একদিন এক বক্তৃতা দেয়, শোনে এক তরুণ সাংবাদিক অনীক সেন ।সে মুগ্ধ হয় রোহিনীর সাহসে। রোহিনী অনীক মধ্যে দেখতে পায় ভালোবাসার ছায়া, কিন্তু নিজেকে টেনে রাখে।
শিউলি এনজিওতে কাজ শুরু করে। সে নিজের মতো আত্মপরিচয় গড়ে তোলে। সে একটি প্রতিবাদ নাটক মঞ্চস্থ করে, যেখানে সে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। সমাজে আলোড়ন তৈরি হয়। সংবাদপত্র শিরোনাম করে: "পতিতার কন্যা নয়, সংগ্রামী নাগরিক শিউলি।"
অনীক তার ভালোবাসা প্রকাশ করে। রোহিনী দ্বিধায় ভোগে। কিন্তু সমাজের চোখে তার পরিচয়? পতিতা।
অনীকের মা এসে তাকে বলে, "তুমি মাটি, আমার ছেলেকে টেনে ধরো না।"
রোহিনী বলে, "আপনার সমাজ আমার শরীর চেয়েছে, মন নয়। এখন আমি আমার সম্মান নিজেই গড়ব।"
সে অনীককে ফিরিয়ে দেয়। কারণ সে ভালোবাসাকে দয়া হিসেবে নয়, সম্মান হিসেবে পেতে চায়।
'ছোট্টা রবি' জেলে যায়, কিন্তু তার লোকেরা রোহিনী ও শিউলির ওপর হামলা চালায়। এনজিও আক্রান্ত হয়। রোহিনী সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে মামলা করে। এই লড়াইয়ে শিউলি গুরুতর আহত হয়। কিন্তু সে রোহিনীকে বলে, "আপু, আমরা হারব না। আমরা তো এখন সমাজের আলো।"
রোহিনী গড়ে তোলে 'চন্দ্রমল্লিকা আশ্রম', পতিতাদের সন্তানদের জন্য। শিউলি হয় প্রধান শিক্ষক।
মৌজু আপা মারা যান, তার কবিতা বই হিসেবে প্রকাশ পায়। আশ্রম সমাজের সম্মান
লাভ করে। রোহিনী জাতীয় পুরস্কার পায়, তবুও
সে সাধারণ জীবন যাপন করে।
রোহিনী বার্ধক্যে
পৌঁছে। একদিন ছোট্ট একটি মেয়ে আসে আশ্রমে। তার চোখে রোহিনী নিজের অতীত দেখতে
পায়।
রোহিনী ফুলগাছে চন্দ্রমল্লিকা দেখে ভাবে, "আমার শরীর একদিন বিক্রি হয়েছে, মন নয়। আমি আজও পবিত্র। সমাজ কবে শিখবে, পবিত্রতা শরীরে নয়, আত্মায়?"
শেষ।
আলোকরেখাতে তোর লেখা !!! খুব ভালো লাগছে বন্ধু। আলোকরেখা আমাদের খুব প্রিয় । এটা যেমন সুন্দর নয়নাভিরাম প্রীতিকর, দৃষ্টিনন্দন এর গঠন তেমনি প্রকাশিত গুণগত লেখার মান । খুব ভাল লাগলো চন্দ্রমল্লিকা গল্পটি ।সমাজের একটা অন্ধকার গলিকে তুলে নিয়ে এসেছিস আলোতে । যা অনেক আশাব্যঞ্জক। খুব ভাল রে ।আর ভাল লেখ এই কামনা করি ।
ReplyDeleteসঞ্চিতা দত্ত-এর "চন্দ্রমল্লিকা "গল্পটি নিছক একজন পতিতার জীবন নয়, বরং এটি এক নারীর আত্মসংগ্রামের আখ্যান, যেখানে সমাজের নিঃসহায়তা, নিষ্ঠুরতা ও দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে এক নারীর আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই চিত্রিত হয়েছে। রোহিনী শুধু শরীরে নয়, মনেও কখনো হার মানেনি, যা মানবিকতার গভীরতম স্তরে নাড়া দেয়। খুব সুন্দর । লেখার মান প্রশংসনীয় । অনেক ভাল থাকবেন । এমন আরও লেখা পাবো এই কামনা ।
ReplyDeleteসঞ্চিতা দত্তের "চন্দ্রমল্লিকা "গল্পটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। গতানুগতিক নয় ভিন্নধর্মী লেখা যা পাঠককে উজ্জবীত করে ।নবজীবনপ্রাপ্ত, নতুনভাবে চেতনাপ্রাপ্ত, উদ্দীপিত বা সঞ্জীবিত করা লেখনী । এমন এক অবস্থাকে তুলে ধরেছেন যা নতুন জীবন পেয়েছে, একটি মেয়ে বিলুপ্ত বা দুর্বল অবস্থা থেকে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে জেগে উঠেছে। অনন্য গল্প । অলংকরণ অনবদ্য যেখানে গল্পের চেতনাকে প্রকাশ করেছে । ভাল থাকবেন ।শুভ কামনা ।
ReplyDeleteসঞ্চিতা দত্তের "চন্দ্রমল্লিকা "গল্পটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। নারীশক্তি ও আত্মমর্যাদার অনন্য রূপায়ণ ।রোহিনী চরিত্রটি নারীশক্তির প্রতীক। তার জীবনের প্রতিটি পর্বে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাকে দমন করতে চাইলেও সে বারবার আত্মমর্যাদার দাবিতে দাঁড়িয়েছে। অনীক সেনের ভালোবাসাকেও সে দয়া হিসেবে নয়, সম্মানের মানদণ্ডে বিবেচনা করে ফিরিয়ে দিয়েছে, যা তাকে এক অনন্য ও দৃঢ়চেতা চরিত্রে পরিণত করেছে। অনেক অনেক শুভেচ্ছা !!!!
ReplyDelete