আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও -আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও-যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে..আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে..এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও..আমার পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান-তার নাইকো বাণী নাইকো ছন্দ নাইকো তান..তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁইয়ে দাও সত্যজিৎ রায় ~ alokrekha আলোক রেখা
1) অতি দ্রুত বুঝতে চেষ্টা করো না, কারণ তাতে অনেক ভুল থেকে যায় -এডওয়ার্ড হল । 2) অবসর জীবন এবং অলসতাময় জীবন দুটো পৃথক জিনিস – বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন । 3) অভাব অভিযোগ এমন একটি সমস্যা যা অন্যের কাছে না বলাই ভালো – পিথাগোরাস । 4) আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও , আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব- নেপোলিয়ন বোনাপার্ট । 5) আমরা জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহন করি না বলে আমাদের শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না – শিলার । 6) উপার্জনের চেয়ে বিতরণের মাঝেই বেশী সুখ নিহিত – ষ্টিনা। 7) একজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি আরেকজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি কে জাগ্রত করতে পারে না- শেখ সাদী । 8) একজন দরিদ্র লোক যত বেশী নিশ্চিত , একজন রাজা তত বেশী উদ্বিগ্ন – জন মেরিটন। 9) একজন মহান ব্যাক্তির মতত্ব বোঝা যায় ছোট ব্যাক্তিদের সাথে তার ব্যবহার দেখে – কার্লাইন । 10) একজন মহিলা সুন্দর হওয়ার চেয়ে চরিত্রবান হওয়া বেশী প্রয়োজন – লং ফেলো। 11) কাজকে ভালবাসলে কাজের মধ্যে আনন্দ পাওয়া যায় – আলফ্রেড মার্শা
  • Pages

    লেখনীর সূত্রপাত শুরু এখান থেকে

    সত্যজিৎ রায়


    সত্যজিৎ রায়, (১৯২১-১৯৯২)

    আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি চলচ্চিত্রকার; আলোকচিত্রী, চিত্রকর, শিশুসাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবেও সুপরিচিত। ১৯২১ সালের ২ মে তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং বাবা সুকুমার রায় দুজনেরই জন্ম হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের অনেক আগেই উপেন্দ্রকিশোর সপরিবারে কলকাতা চলে যান। পিতা প্রখ্যাত লেখক, সম্পাদক ও আলোকচিত্রী সুকুমার রায় ছিলেন রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব গ্রেট ব্রিটেন-এর ফেলো। তাঁর মাতা সুপ্রভা রায় ছিলেন একজন সঙ্গীতশিল্পী ও হস্তশিল্পে পারদর্শী এবং তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীও ছিলেন প্রখ্যাত লেখক, শিশু সাহিত্যিক, চিত্রকর, আলোকচিত্রী, ব্লক ডিজাইনার এবং শিশুতোষ পত্রিকা সন্দেশ (১৯১৩)-এর সম্পাদক। জন্মের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই পিতাকে হারিয়ে মামার আশ্রয়ে দৃঢ়চেতা মাতার তত্ত্বাবধানে সত্যজিৎ রায়ের শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয়। বালিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বি.এ পাসের পর ১৯৪০ সালে সত্যজিৎ রায় শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন।


    উপেন্দ্রকিশোরের সময়েই সত্যজিতের পরিবারের ইতিহাস এক নতুন দিকে মোড় নেয়। লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক, প্রকাশক ও শখের জ্যোতির্বিদ উপেন্দ্রকিশোরের মূল পরিচিতি ১৯শ শতকের বাংলার এক ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম নেতা হিসেবে। উপেন্দ্রকিশোরের ছেলে সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ননসেন্স ও শিশু সাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন। দক্ষ চিত্রকর ও সমালোচক হিসেবেও সুকুমারের খ্যাতি ছিল। ১৯২১ সালে কলকাতায় জন্ম নেন সুকুমারের একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের মাত্র তিন বছর বয়সেই বাবা সুকুমারের মৃত্যু ঘটে; মা সুপ্রভা দেবী বহু কষ্টে তাঁকে বড় করেন। সত্যজিৎ বড় হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়তে যান, যদিও চারুকলার প্রতি সবসময়েই তাঁর দুর্বলতা ছিল। ১৯৪০ সালে সত্যজিতের মা তাঁকে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। কলকাতাপ্রেমী সত্যজিৎ শান্তিনিকেতনের শিক্ষার পরিবেশ সম্বন্ধে খুব উঁচু ধারণা পোষণ করতেন না, কিন্তু শেষে মায়ের প্ররোচনা ও রবিঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধার ফলে রাজি হন।শান্তিনিকেতনে গিয়ে সত্যজিৎ প্রাচ্যের শিল্পের মর্যাদা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। পরে তিনি স্বীকার করেন যে সেখানকার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছিলেন। সত্যজিৎ বিনোদবিহারীর ওপর পরবর্তীকালে একটি প্রামাণ্যচিত্রও বানান। অজন্তা, ইলোরা এবং এলিফ্যান্টায় ভ্রমণের পর ভারতীয় শিল্পের ওপর সত্যজিতের গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মায়।


    ১৯৪৩ সালে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। বিজ্ঞাপনের ভাষা ও ডিজাইনে তিনি নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। প্রায় একই সময়ে তিনি বইয়ের প্রচ্ছদ এবং পত্রিকায় ছবি অাঁকা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় গঠন করেন কলকাতা চলচ্চিত্র সংসদ। পরবর্তী বছরে তাঁর সুযোগ ঘটে ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ রেনোয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। রেঁনোয়া তাঁর পরিচালিত দ্য রিভার ছবির কিছু অংশ কলকাতায় শুটিং করেন এবং সত্যজিৎ তা প্রত্যক্ষ করেন।



    পরে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে তিনি গঠন করেন ‘কনক পিকাচার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সত্যজিৎ এ সময় এ পারফেক্ট ডে নামে একটি চিত্রনাট্য রচনা করেন। ১৯৫০ সালে চাকরির সূত্রে পাঁচ মাস লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রায় একশ চলচ্চিত্র দেখেন এবং পরিচিত হন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ পেনেলোপি হাস্টন এবং গ্যাবিন ল্যাম্বটি-এর সঙ্গে। ইতালির ভিত্তোরিও ডি সিকা পরিচালিত দ্য বাইসাইকেল থিফ দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস পথের পাঁচালী অবলম্বনে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। একই বছর অক্টোবরে দেশে ফিরে তিনি এর চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং ১৯৫২ সালে অপেশাদার লোকজন নিয়ে ছবির শুটিং শুরু করেন। বহু ধারদেনা এবং গহনা, বইপত্র ও সঞ্চিত সম্পদ বিক্রয় করেও তিনি ছবির কাজ শেষ করতে পারেন নি। নিজের জীবন বীমার পলিসি বন্ধক দিয়ে ও বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়দের কাছ থেকে তিনি মাত্র ১৭,৫০০ টাকা সংগ্রহ করেন।
    রবীন্দ্রনাথের সাথে রায় পরিবারের বিশেষ হৃদ্যতা ছিল। ফলে সত্যজিতের মা চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করুক। যদিও সত্যজিৎ কলকাতার মায়া ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনে যেতে প্রথম দিকে অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মায়ের উৎসাহে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানকার কলাভবনে ভর্তি হন। এই সূত্রে তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছে শিক্ষালাভের সুযোগ পান। নিয়মানুযায়ী বিশ্বভারতীতে সত্যজিতের পাঁচ বছর পড়াশোনা করার কথা থাকলেও তার আগেই তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। মূলত ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় জাপানিরা বোমাবর্ষণ করে। এই সময় তিনি শান্তিনকেতন থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর আর শিক্ষার জন্য শান্তিনিকেতন যান নি।


    ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ডি জে কেমের (D.J. Keymer) নামক ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায় 'জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার' পদে যোগদান করেন। এখানে তিনি বেতন পেতেন  ৮০ টাকা। ইনি প্রথম বিজ্ঞাপনে ভারতীয় ধাঁচের ক্যালিওগ্রাফিক উপাদান ব্যবহার করা শুরু করেন। একই সাথে তিনি অক্ষরশৈলীতে বিশেষ আগ্রাহী হয়ে উঠেন। তাঁর নকশা করা দুটি ফন্ট 'Ray Roman' এবং 'Ray Bizarre' ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেছিল।

    এই প্রতিষ্ঠানে চিত্রসজ্জা'র কাজ তিনি আনন্দের সাথেই করতেন। এই সময় বিজ্ঞাপন সংস্থার ইংরেজ ও ভারতীয় কর্মচারীদের মধ্যে বেতনাদি নিয়ে চাপা উত্তেজনা চলছিল। কারণ দেশী কর্মচারীদের তুলনায় ইংরেজ কর্মচারীদেরকে অনেক বেশি বেতন দেয়া হতো। এই সময় তাঁর অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মী ডি.কে, দাসগুপ্ত 'সিগনেট প্রেস' নামক একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠিত করেন। গোড়া থেকেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের চিত্রশিল্পী হিসাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ডি.কে. দাসগুপ্ত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী' উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন এবং এই গ্রন্থের চিত্রসজ্জার দায়িত্ব পড়ে সত্যাজিতের উপর। উল্লেখ্য, সত্যজিৎ তখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ততটা পড়েন নি। তাঁর প্রায় সকল পড়াশুনা ছিল ইংরেজিতে লিখা উপন্যাস ও অন্যান্য গ্রন্থাদি। এমন কি তখনো রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোও তিনি বিশেষভাবে পড়েন নি। এই অবস্থায় তিনি পথের পাঁচালী পড়লেন এবং মুগ্ধ হলেন। ডি. কে গুপ্ত এই প্রকাশনার কাজে আসার আগে একটি চলচ্চিত্র পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ইনিই প্রথম সত্যজিৎকে বলেন যে, 'পথের পাঁচালী' থেকে খুব ভালো একটি চলচ্চিত্র হতে পারে। এই প্রকাশনায় কাজ করার সুবাদে তিনি ব্যাপকভাবে বাংলা গদ্য সাহিত্যের সাথে পরিচিত হন। যা তা পরবর্তী সময়ে বাংলা উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণে বিশেষ সহায়তা করেছিল।

    এই সময় থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে চলচ্চিত্র দেখা শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সাথে যোগাযোগ করে- নতুন মার্কিন চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়ে খবর নিতেন। বিশেষ করে নরম্যান ক্লেয়ার নামের রয়েল এয়ার ফোর্সের এক কর্মচারী এ বিষয়ে তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলকাতার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে হলিউডে নির্মিত প্রচুর ছবি দেখানো হতো। এই সূত্রে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলো কলকাতার চলচ্চিত্র প্রেমিকদের কাছে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ এবং বংশীচন্দ্র দাসগুপ্ত কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোসাইটিতে চলচ্চিত্র দেখানো হতো এবং এই বিষয়ে পরে ঘরোয়াভাবে আলোচনার ব্যবস্থা করা হতো। উল্লেখ্য এই সমিতি প্রথম প্রদর্শন করেছিল Battleship Potemkin (১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে রচিত নির্বাক চলচ্চিত্র। পরিচালক ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার Sergei Eisenstein)



    এই সময় সত্যজিৎ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইংরেজি ও বাংলাতে চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। ১৯৪৮-১৯৭১ এর মধ্যে রচিত এই প্রবন্ধগুলোর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে -Our Films, Their Films নামে। ইতিমধ্যে ইনি চিত্রনাট্য রচনায় বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজের আনন্দের জন্য চিত্রনাট্য লিখতেন এবং তার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। যে সকল ছবি তৈরি হবে, তার ঘোষণা পত্রিকায় আসার পরপরই, তিনি সেই ঘোষিত ছবির মূল উপন্যাস বা গল্প পড়ে নিজের মতো করে চিত্রনাট্য তৈরি করতেন। পরে ওই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলে, তিনি নিজের চিত্রনাট্যের সাথে তুলনা করে, তাঁর ক্ষমতা যাচাই করে নিতেন। এই সময় তাঁর বন্ধু হরিসাধন দাসগুপ্ত রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে ছবি তৈরি করার জন্য বিশ্বভারতী থেকে অনুমোদন পান। সেই সূত্রে সত্যজিৎ ঘরে বাইরে উপন্যাসের চিত্রনাট্য রচনা করেন। কথা ছিল এই ছবির পরিচালনা করবেন হরিসাধন দাসগুপ্ত নিজে। কিন্তু ছবির প্রযোজকের এক বন্ধু এই চিত্রনাট্যের পরিবর্তনের জন্য বিশেষ পীড়াপীড়ি শুরু করলে, সত্যজিৎ এই চিত্রনাট্য আর হরিসাধনকে দেন নি। প্রায় ৩৫ বৎসর পর সত্যজিৎ যখন ঘরে বাইরে ছবি তৈরিতে হাত দেন, তখন উপলব্ধি করেন যে, তাঁর পূর্বের চিত্রনাট্য অনুসরণে ছবিটি যে তৈরি হয় নি, সেটা নিঃসন্দেহে ভালো হয়েছিল। ৩৫ বৎসর পর তাঁর মনে হয়েছিল ওই চিত্রনাট্যটি ছিল 'হলিউডের ধাঁচে একজন অপেশাদারীর উদ্যোগ'

    উল্লেখিত কারণে, সত্যজিৎ সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পরিচিত হয়ে না উঠলেও, কলকাতার চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর নামটি বেশ সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল। এই কারণেই ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোর (Jean Renoir) তাঁর The River ছবি নির্মাণের জন্য কলকাতায় আসেন, তখন সত্যজিৎকে তাঁর ছবির চিত্রগ্রহণের উপযোগী স্থান খোঁজার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী হিসাবে খুঁজে নিয়েছিলেন। এটাই ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকারের সাথে তাঁর প্রথম পরিচয়। এই সময়ই তিনি রেনোর'র কাছে পথের পাঁচালী-র চলচ্চিত্রায়ণ নিয়ে আলাপ করেন। রেনোর এই বিষয়ে বিশেষভাবে তাঁকে উৎসাহিত করেন। এবং অনেকে মনে করেন, বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের মৌলিক উপাদনগুলো সম্পর্কে রেনরো-র কাছ থেকে তিনি বিশেষ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

    ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে সত্যজিৎ তাঁর দূরসম্পর্কের বোন ও বহুদিনের বান্ধবী বিজয়া দাসকে বিয়ে করেন। রেনোর তাঁর ছবিতে সত্যজিতের বন্ধু বংশী চন্দ্র গুপ্তকে শিল্প নির্দেশক এবং সহযোগী হিসাবে নেন হরিসাধন দাসগুপ্তকে। এই ছবিতে সুব্রত মিত্রও ছিলেন। পরে ইনি সত্যজিৎ -এর ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করেছেন। এই ছবিতে কাজ করার জন্য সত্যজিতের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তিনি তখনও বিজ্ঞাপন সংস্থায় শিল্প নির্দেশক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এই সংস্থা সত্যজিৎকে তাদের লণ্ডনস্থ প্রধান অফিসে কাজ করার জন্য পাঠান। সত্যজিৎ এই কাজের জন্য জাহাজযোগে সস্ত্রীক লণ্ডনে যান ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে। জাহজে যেতে তাঁদের ১৬ দিন সময় লেগেছিল। এই সময়ে তিনি পথের পাঁচালী ছবি কিভাবে তৈরি করবেন, তার খসড়া তাঁর নোট বইতে লিখা শুরু করেন। পথের পাঁচালী  তৈরিতে তিনি কোন দিকনির্দেশনা অনুসরণ করবেন, সে সম্পর্কে এই নোট বই থেকে জানা যায়। তিনি এক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এগুলো হলো- তাঁর ছবির চিত্রায়ণ হবে বাস্তব কোন অঞ্চলে, নতুন মুখ নেবেন এবং কোনো মুখসজ্জা (make-up) থাকবে না।

    লণ্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রায় শ'খানেক চলচ্চিত্র দেখেন। এর ভিতরে ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী ছবি লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে (ইতালীয় Ladri di biciclette ইংরেজি Bicycle Thieves (সাইকেল চোর) দেখেন। এই ছবিটি তাঁকে পথের পাঁচালী তৈরিতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। কারণ, তাঁর বাস্তববাদী চলচ্চিত্র দর্শকরা গ্রহণ করবে কিনা এ নিয়ে তাঁর যথেষ্ঠ সংশয় ছিল। এক্ষেত্রে তাঁর পরিচিত অনেকেই এই জাতীয় ছবি তৈরিতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। এমন কি এই ছবি তৈরি করার প্রারম্ভিক মুহূর্ত থেকে শুরু করে মুক্তি পাওয়ার পূর্বকাল পর্যন্ত অনেকেই এই ছবির সাফল্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন এবং তা সত্যজিতের কাছে দৃঢ়ভাবে প্রকাশও করেছিলেন। Bicycle Thieves  ছবি দেখার পর তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ছবি সফলতা পাবেই।


    সত্যজিৎ সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নব্য-বাস্তবাবাদী ধারার ছবি তৈরি করবেন। তিনি তাঁর Our Films, Their Films গ্রন্থে এ বিষয়ে লিখেছেন- "All through my stay in London, the lessons of Bicycle Thieves and neo-realist cinema stayed with me"এই ছবি দেখেই তিনি তাঁর জাহাজে লিখিত নোট বইয়ের সিদ্ধান্তকে (বাস্তব স্থান এবং মুখসজ্জা ছাড়া নতুনমুখ) দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এবং জাহজে ফেরার পথে, পথের পাঁচালী তৈরির আনুসঙ্গিক প্রস্তুতি কাগজকলমে সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে তিনি কলকাতা ফিরে এসে একজন প্রোডিউসারের সন্ধান করতে থাকেন। ইতিমধ্যে তিনি নতুন মুখও খুঁজতে শুরু করলেন। এ ছবি বানানোর জন্য তিনি কিছু পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন কুশলীকে একত্রিত করতে সক্ষম হন। এর ভিতরে পূর্ব-অভিজ্ঞতা আছে এমন কিছু লোককে রাজি করালেন। এঁদের ভিতরে ক্যামেরাম্যান হিসাবে সুব্রত মিত্র ও শিল্প নির্দেশনায় বংশী চন্দ্রগুপ্তকে নিলেন। এঁরা দুজনই ইতিমধ্যে রেনোর দ্যা রিভার  ছবিতে কাজ করে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এঁদের সাথে অনিল চৌধুরী যুক্ত হয়েছিলেন প্রোডাক্শন কন্ট্রোলার হিসাবে।
    পরে তিনি ব্যয় কম করার জন্য পুরানো ক্যামেরা ভাড়া করেন, খাদ্য ও যাতায়াত খরচ কমিয়ে দেন এবং কলকাতার প্রত্যন্ত এলাকায় শুটিং করেন।

    তিনি একজন প্রযোজকের সন্ধান করছিলেন যিনি অন্তত ৪০,০০০ টাকা অর্থায়নে সক্ষম। ছবির এক-তৃতীয়াংশ চিত্রায়িত হওয়ার পর যোগাড় করা টাকা শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের সরকারের কাছে অর্থসাহায্য কামনা করেন। এ বিষয়ে আমলাদের অনীহা প্রত্যক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় নিজে ছবিটির নির্মাণ ব্যয় সংকুলানের ব্যবস্থা করেন। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী নিউইয়র্কে প্রদর্শিত হয় এবং ঐ বছরই, আগস্টে কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। মুক্তির পরপরই ছবিটি সারা বিশ্বে প্রশংসা লাভ করে এবং পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করে। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী রাষ্ট্রপতি ও পশ্চিমবঙ্গ সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার লাভ করে। ঐ বছরই ছবিটি ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মানব দলিল’ হিসেবে জুরি বোর্ডের বিশেষ পুরস্কার অর্জন করে।

    ছবিটি পৃথিবীর বিভিন্ন শহর ও দেশ, যথা এডিনবার্গ, ম্যানিলা, স্পেন, সানফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ভ্যাঙ্কুবার, ডেনমার্ক ও জাপানে পুরস্কৃত হয়। ১৯৫৬-তে মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় ছবি অপরাজিত, এটি তাঁকে এনে দেয় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার, গোল্ডেন লায়ন, Cinema Nuveall এবং ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড। ১৯৫৬ থেকে ১৯৯২-এর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত চলচ্চিত্র মিশে ছিল তাঁর চিন্তা ও কর্মে। তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা দশজন চলচ্চিত্রকারের মধ্যে একজন। তাঁর চলচ্চিত্র কর্মের মধ্যে রয়েছে ২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চিত্র, ৫টি তথ্যচিত্র এবং ৩টি টেলি-ফিল্ম। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহের মধ্যে উলে­খযোগ্য হলো: পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬), পরশপাথর (১৯৫৭), জলসাঘর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিন কন্যা (১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সিকিম (১৯৭১), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল­া (১৯৭৪), ইনার আই (১৯৭৪), জনারণ্য (১৯৭৫), বালা (১৯৭৬), শতরঞ্জ কি খিলাড়ি (১৯৭৭), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), পিকু (১৯৮২), সদগতি (১৯৮২), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), সুকুমার রায় (১৯৮৭), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১)। এছাড়াও তিনি বহু ছবির চিত্রনাট্য রচনা ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন।


    লেখক হিসেবেও সত্যজিৎ রায় খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: বিষয় চলচ্চিত্র, একেই বলে শুটিং, আওয়ার ফিল্মস দেয়ার ফিল্মস, ফেলুদা সিরিজ, শঙ্কু সিরিজ, পিকুর ডায়েরী ইত্যাদি। পুরস্কার: পথের পাঁচালী-এর জন্য ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬-এর মধ্যে ভারত ছাড়াও মোট ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার; অপরাজিত পেয়েছে ভেনিস, সানফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ডেনমার্কসহ ৫টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’ ও ‘ইনার আই’ এবং টিভি চিত্র ‘সদগতি’ও পেয়েছে দেশ-বিদেশের পুরস্কার। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তিনি পেয়েছেন বিশেষ সম্মান ও পুরস্কার। তিনি ভারত সরকারের নিকট থেকে ৪০টি পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ৬০টি পুরস্কার লাভ করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’, ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরস্কার, ম্যাগসেসেই পুরস্কার, ফ্রান্সের ‘লিজিয়ন অব অনার’ (১৯৮৭), ‘ভারতরত্ন’ (১৯৯২), বিশেষ ‘অস্কার’ (১৯৯২) পুরস্কার ইত্যাদি। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যু হয় ।




    সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রের কালানুক্রমিক তালিকা
    পথের পাঁচালী (১৯৫৫)
    অপারিজত (১৯৫৬)
    পরশপাথর (১৯৫৮)
    জলসাঘর (১৯৫৮)
    অপুর সংসার (১৯৫৯)
    দেবী (১৯৬০)
    তিনকন্যা [পোষ্টমাস্টার, মনিহার, সমাপ্তি] (১৯৬১)
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১)
    কাঞ্জনজঙ্ঘা (১৯৬২)
    অভিযান (১৯৬২)
    মহানগর (১৯৬৩)
    চারুলতা (১৯৬৪)
    টু (১৯৬৪)
    কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)
    নায়ক (১৯৬৬)
    চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
    গুপী গাইন বাঘ বাইন (১৯৬৮)
    অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯)
    প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)
    সীমাবদ্ধ (১৯৭১)
    সিকিম (১৯৭১)
    The Inner Eye (১৯৭২)
    অশনী সংকেত (১৯৭৩)
    সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
    জান অরণ্য (১৯৭৫)
    বালা (১৯৭৬)
    সতরঞ্জী কে খিলাড়ি (১৯৭৭)
    জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮)
    হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)
    পিকু (১৯৮০)
    সদগতি (১৯৮১)
    ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
    সুকুমার রায় (১৯৮৭)
    গণশত্রু (১৯৮৯)
    শাখা-প্রশাখা (১৯৯০)
    আগন্তুক (১৯৯১)

    সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্যে সৃষ্ট চলচ্চিত্র
    বাক্স বদল । পরিচালক নিত্যান্দ দত্ত
    ফটিক চাঁদ। পরিচালক সন্দীপ রায়
    Satyajit Ray Presents (13 shorts for TV, Stories by Satyajit Ray), Director - Sandip Ray
    Satyajit Ray Presents 2 (a TV series based on 2 long stories and a Feluda novel by Satyajit Ray),
                  Director - Sandip Ray.
    Shakespeare Wallah (feature), Director – James Ivory
    উত্তরণ । পরিচালক সন্দীপ রায়
    টার্গেট । পরিচালক সন্দীপ রায়
    সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র
    লেখক
    কাঞ্চনজংহা
    নায়ক
    আগন্তউক
    হীরক রাজার দেশে
    শাখাপ্রশাখা
    গুপি বাঘা ফিরে এল
    সোনার কেল্লা
    সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার
    ১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ দি এলিয়েন নামের একটি ছবির জন্য চিত্রনাট্য লেখেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যৌথ প্রযোজনার এই ছবিটির প্রযোজক ছিল কলাম্বিয়া পিকচার্স এবং পিটার সেলার্স ও মার্লোন ব্রান্ডো ছবিটির প্রধান অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রনাট্য লেখা শেষ করার পর সত্যজিৎ জানতে পারেন যে সেটির স্বত্ব তাঁর নয় ও এর জন্য তিনি কোন সম্মানীও পাবেন না। পরবর্তীতে মার্লোন ব্র্যান্ডো প্রকল্পটি ত্যাগ করেন। তাঁর স্থানে জেমস কোবার্ন-কে আনার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ততদিনে সত্যজিতের আশাভঙ্গ ঘটে এবং তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। পরে ৭০ ও ৮০-র দশকে কলাম্বিয়া বহুবার প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ১৯৮২ সালে যখন ই.টি. দি এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল মুক্তি পায়, তখন অনেকেই ছবিটির সাথে সত্যজিতের লেখা চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পান। সত্যজিৎ ১৯৮০ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যগাজিনে লেখা একটি ফিচারে প্রকল্পটির ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেন ও পরে সত্যজিতের জীবনী লেখক অ্যান্ড্রু রবিনসন এ ঘটনার ওপর আরও বিস্তারিত লেখেন (১৯৮৯ সালে প্রকাশিত দি ইনার আই-এ)। সত্যজিৎ বিশ্বাস করতেন যে তাঁর লেখা দি এলিয়েন-এর চিত্রনাট্যটির মাইমোগ্রাফ কপি সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে না পড়লে স্পিলবার্গের ছবিটি বানানো হয়ত সম্ভব হত না।


    চলচ্চিত্রসমূহের তালিকা
    পরিচালক হিসেবে
    বছর  ছবি   পরিচালক     কাহিনিকার    মন্ত্রব্য
    ১৯৫৫ পথের পাঁচালী        বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে এবং ১৯৯১ সালে একাডেমি পুরস্কার লাভ করে। ছবিটি অপু ত্রয়ি হিসেবে পরিচিত।
    ১৯৫৭  অপরাজিত               ছবিটি অপু ত্রয়ি হিসেবে পরিচিত
    ১৯৫৮ পরশপাথর               অপু ত্রিলজির পরে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র
    ১৯৫৮ জলসাঘর          তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়
    ১৯৫৯ অপুর সংসার             ছবিটি অপু ত্রয়ি হিসেবে পরিচিত
    ১৯৬০ দেবী            
    ১৯৬১ তিন কন্যা               রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি পায়
    ১৯৬১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর          
    ১৯৬২ কাঞ্চনজঙ্ঘা         তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় উপন্যাস থেকে নেয়া
    ১৯৬২ অভিযান          
    ১৯৬৩ মহানগর     নরেন্দ্রনাথ মিত্র জয়া বচ্চন প্রথম এই ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে আসেন
    ১৯৬৪ চারুলতা     রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় গল্প নষ্টনীড় অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য রচিত হয়েছে
    ১৯৬৫ Two                                       দূরদরশনের জন্য নিরমিত
    ১৯৬৫ কাপুরুষ      প্রেমেন্দ্র মিত্র  
    ১৯৬৬ মহাপুরুষ          রাজশেখর বসু (পরশুরাম)   
    ১৯৬৬ নায়ক           
    ১৯৬৭ চিড়িয়াখানা             
    ১৯৬৯ গুপী গাইন বাঘা বাইন       উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ১৯৭০  অরণ্যের দিনরাত্রি          সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়    
    ১৯৭১  প্রতিদ্বন্দ্বী           কলকাতা ত্রয়ী
    ১৯৭১  সীমাবদ্ধ           কলকাতা ত্রয়ী
    ১৯৭১  সিকিম           
    ১৯৭২  দ্য ইনার আই            
    ১৯৭৩ অশনি সংকেত           
    ১৯৭৪  সোনার কেল্লা             ফেলুদা সিরিজ
    ১৯৭৬ জনঅরণ্য                কলকাতা ত্রয়ী
    ১৯৭৬ বালা            
    ১৯৭৭  শতরঞ্জ কি খিলাড়ি               উর্দু চলচ্চিত্র
    ১৯৭৮ জয় বাবা ফেলুনাথ               ফেলুদা সিরিজ
    ১৯৮০ হীরক রাজার দেশে    সন্দ্বীপ রায়        
    ১৯৮১ পিকু             দূরদরশনের জন্য নিরমিত
    ১৯৮১ সদগতি            দূরদরশনের জন্য নিরমিত
    ১৯৮৪ ঘরে বাইরে         রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    ১৯৮৭ সুকুমার রায়             তথ্য চিত্র
    ১৯৮৯ গণশত্রু      হেনরিক ইবসেন হেনরিক ইবসেনের An Enemy of the People অবলম্বনে তৈরি করা।
    ১৯৯০ শাখা প্রশাখা             
    ১৯৯১  আগন্তুক           তার পরিচালনায় শেষ ছবি
    লেখক হিসেবে[সম্পাদনা]
    তিনতোরেত্তোর যীশু (২০০৬) (উপন্যাস, চিত্রনাট্য, গল্প)
    বোম্বাইয়ের বোম্বেটে (২০০৩) (উপন্যাস, চিত্রনাট্য, গল্প)
    টার্গেট (১৯৫৫)
    উত্তরণ (১৯৯৪) (গল্প)
    আগন্তুক (১৯৯১) (চিত্রনাট্য, গল্প)
    গুপী বাঘা ফিরে এলো (১৯৯১) (গল্প)
    শাখা প্রশাখা (১৯৯০)
    গণশত্রু (১৯৮৯)
    ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
    ফটিক চাঁদ (১৯৮৩) (উপন্যাস)
    পিকুর ডায়রি (১৯৮১) (টিভি)
    সদগতি (১৯৮১) (টিভি, কথোপকথন)
    হীরক রাজার দেশে (১৯৮০) (টিভি)
    জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮) (উপন্যাস)
    শতরঞ্জ কি খিলাড়ি (১৯৭৭) (কথোপকথন, চিত্রনাট্য)
    জনঅরণ্য (১৯৭৬)
    সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
    অশনি সংকেত (১৯৭৩)
    প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭২)
    দ্য ইনার আই (১৯৭২)
    সিকিম (১৯৭১)
    অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০)
    বাক্স বদল (১৯৭০)
    গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৮) (চিত্রনাট্য)
    চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
    নায়ক (১৯৬৬)
    কাপুরুষ (১৯৬৫)
    চারুলতা (১৯৬৪)
    মহানগর (১৯৬৩)
    অভিযান (১৯৬২)
    কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২)
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১)
    তিন কন্যা (১৯৬১)
    দেবী (১৯৬০)
    অপুর সংসার (১৯৫৯)
    জলসাঘর (১৯৫৮)
    অপরাজিত (১৯৫৭)
    পথের পাঁচালি (১৯৫৫)

    ছিন্নমূল (১৯৫০

    সানজিদা রুমি কর্তৃক গ্রথিত http://www.alokrekha.com

    4 comments:

    1. মুজিব মেহরানNovember 4, 2017 at 3:05 PM

      আলোকরেখা নিজেকে আলোকিত করার অনেক সুযোগ পাই ।আলোকরেখার চলার পথ সুগম ও সুন্দর হোক এই কামনা রইল।

      ReplyDelete
    2. নুরুল কবিরNovember 5, 2017 at 4:14 PM

      খুব ভালো লাগলো সানজিদা রুমির সত্যজিৎ রায়ের উপর লেখা পড়ে। খুবই তথ্যবহুল। একই জায়গায় সবটুকু পড়তে পেরে বিশেষ সাচ্ছন্দ ও আত্মতৃপ্ত বোধ হচ্ছে যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। আলোকরেখাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      ReplyDelete
    3. মামুন রাশিদNovember 5, 2017 at 7:36 PM

      বাংলাদেশর অনেক ভাগ্য যে আমাদের দেশের নায়িকা ববিতা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা অশনি সংকেত-এ অভিনয় করেছে।

      ReplyDelete
    4. অনেক তথ্য পেলাম পোস্ট টা পরে। এমন আরও তথ্য বহুল পোস্ট চাই। শুভ কামনা ।

      ReplyDelete

    অনেক অনেক ধন্যবাদ