আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও -আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও-যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে..আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে..এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও..আমার পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান-তার নাইকো বাণী নাইকো ছন্দ নাইকো তান..তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁইয়ে দাও স্মৃতি শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের নিউইয়র্কের আড্ডার দিনগুলো মাহফুজা শীলু | ~ alokrekha আলোক রেখা
1) অতি দ্রুত বুঝতে চেষ্টা করো না, কারণ তাতে অনেক ভুল থেকে যায় -এডওয়ার্ড হল । 2) অবসর জীবন এবং অলসতাময় জীবন দুটো পৃথক জিনিস – বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন । 3) অভাব অভিযোগ এমন একটি সমস্যা যা অন্যের কাছে না বলাই ভালো – পিথাগোরাস । 4) আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও , আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব- নেপোলিয়ন বোনাপার্ট । 5) আমরা জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহন করি না বলে আমাদের শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না – শিলার । 6) উপার্জনের চেয়ে বিতরণের মাঝেই বেশী সুখ নিহিত – ষ্টিনা। 7) একজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি আরেকজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি কে জাগ্রত করতে পারে না- শেখ সাদী । 8) একজন দরিদ্র লোক যত বেশী নিশ্চিত , একজন রাজা তত বেশী উদ্বিগ্ন – জন মেরিটন। 9) একজন মহান ব্যাক্তির মতত্ব বোঝা যায় ছোট ব্যাক্তিদের সাথে তার ব্যবহার দেখে – কার্লাইন । 10) একজন মহিলা সুন্দর হওয়ার চেয়ে চরিত্রবান হওয়া বেশী প্রয়োজন – লং ফেলো। 11) কাজকে ভালবাসলে কাজের মধ্যে আনন্দ পাওয়া যায় – আলফ্রেড মার্শা
  • Pages

    লেখনীর সূত্রপাত শুরু এখান থেকে

    স্মৃতি শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের নিউইয়র্কের আড্ডার দিনগুলো মাহফুজা শীলু |




    স্মৃতি

    শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের নিউইয়র্কের আড্ডার দিনগুলো
    মাহফুজা শীলু |     

    শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমি একই শহরে ছিলাম, বড় আনন্দের। আমি শহীদ কাদরীর পরিবারের একজন হতে পেরেছিলাম, বড় শ্লাঘার। কবিতা ভালোবাসি সে ছিল আমার প্রথম যোগ্যতা। তিরিশের কবিদের ভালোবাসি, সে আমার বাড়তি যোগ্যতা। আর বুদ্ধদেব বসুর লেখা ভালোবাসি বলে সরাসরি প্রিয়জনদের সামনের কাতারে চলে এলাম শহীদ ভাইয়ের। নিউইয়র্কের পারসন্স বুলেভার্ডের বাড়িটির দরোজা আক্ষরিক অর্থেই খোলা ছিল। শহীদ ভাই আর নীরা আপার খোলা হৃদয়টির মতো। কত মধুর সময় আমরা কাটিয়েছি সেখানে! দেশে প্রায় পাকাপাকিভাবে চলে আসি ২০০৯-এ। নিউইয়র্ক থাকাকালীন আমরা নিয়মিতই আড্ডা দিয়েছি শহীদ ভাইয়ের বাসায়, হাসান ফেরদৌস ভাইয়ের বাসায়, কখনও কোনো রেস্টুরেন্টে, কখনও অকালপ্রয়াত মোমেন ভাইয়ের বাসায়, কখনও আমাদের বাসায়, কখনও-বা আমার বড়বোন নীলুর রকল্যান্ডের বাসায়। আমি দেশে ফিরে আসার পরে শুনতাম আমার বড় ভাই লেখক ফেরদৌস সাজেদীনের সঙ্গে নীরা আপা আর শহীদ ভাইয়ের অন্তরঙ্গতার কথা। ততদিনে সাহিত্য একাডেমী নামে ওঁরা একটি সংগঠন করেছেন।


    একবার হাসান ভাইয়ের বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম আমরা। সেদিন অনেকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আনন্দবাজার পত্রিকার সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, পূরবী বসু, জোতিপ্রকাশ দত্তসহ আরও অনেকে। যতদূর মনে পড়ছে, বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী দত্ত, বিখ্যাত সাংবাদিক জ্যোর্তিময় দত্তও ছিলেন সেদিন। শহীদ ভাইয়ের একটি নতুন কবিতার জন্য সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত খুব পীড়াপীড়ি করছিলেন। শহীদ ভাই কিছুতেই রাজি হলেন না। সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত উঠে গিয়ে কবিতার জন্য অগ্রিম পারিশ্রমিক জোর করে শহীদ ভাইয়ের পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। যেন টাকা পান না বলেই শহীদ কাদরী কবিতা লেখেন না! শহীদ ভাই টাকা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আরে, আমাকে দিয়ে হবে না। টাকা নিয়ে নাও,’ বলে ফেরত দিলেন টাকা। আমরা সবাই বিষন্ন হয়ে পড়ি। -হা কবিতার বরপুত্র! কোন অভিশাপে আজ কবিতায় এত বিমুখ! পরবাস মানুষকে এত নিষ্ফলা করে দেয়?


    দেশে আসার দুবছর পরে নিউইয়র্কে বেড়াতে যাই ২০১১- গ্রীষ্মে। সেবার বেশ কয়েকদিন আমি কন্যা বসুধাসহ শহীদ ভাইদের বাসায় ছিলাম। যেদিন ডায়ালিসিস নিতে হতো না, সেদিন আমরা অনেক কথা বলতাম। নীরা আপা হয়তো অফিসে গেছেন। সাহায্যকারী মহিলাটি আপন মনে কাজ করে যাচ্ছেন। কখনও শহীদ ভাই তাঁকে ডেকে প্রয়োজনীয় কথা বলছেন। কী পরিশীলিত ব্যবহার! নীরাআপা মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফোন করে খোঁজ খবর করতেন। ওঁদের দুজনের বন্ধুত্বটা ছিল দেখবার মতো। একসঙ্গে বসে প্রচুর আড্ডা দিতেন। সারে-গা-মা-পা দেখতেন টেলিভিশনে। তখন কে বলে শহীদ কাদরী উন্নাসিক? এবং রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া আর কিছুতে আগ্রহ কম! কখনও কোনো বই নিয়ে কথা বলতেন দুজন। বাসায় অতিথি এলে তাঁদেরকে যথাযোগ্য মনোযোগ দিতেন। প্রিয় বিষয় নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করতেন শহীদ ভাই। শুনতেও পছন্দ করতেন। তবে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে কখনও নাক গলাতেন না। শহীদ কাদরী সর্ব অর্থে ছিলেন একজন আধুনিক মানুষ।



    সেবার নীরা আপা, বসুধা আর আমি বাইরে বাইরে ঘুরেছি অনেক। কখনও বাইরে খেতে গেলে নীরা আপা শহীদ ভাইকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন, ‘শহীদ, তোমার জন্য আজ কী খাবার আনব?’ শহীদ ভাই বেশিরভাগ সময়ই পছন্দ করতেন নান আর কাবাব। ঘরে ফিরে এলে খেতে খেতে আমাদের সব গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। শহীদ ভাই শুধু একটা জিনিস নীরা আপাকে লুকিয়ে করতেন। ধূমপান। নীরা আপার কড়া নিষেধ ছিল, যেন কেউ শহীদ ভাইকে সিগারেট না দেয়। তবু কেউ কেউ সে কথা মানতেন না। নীরা আপা অনেকদিন পরে এই লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার কথা জানতে পেরে শহীদ ভাইকে বলেছিলেন, ‘তোমার খুব খেতে ইচ্ছে করলে মাঝে-সাঝে খেও। লুকিয়ে খাওয়ার দরকার কী?’ তারও বেশ কিছুদিন পরে শহীদ ভাই নীরা আপাকে বলেছিলেন,‘নীরা, তুমি সিগারেট খাওয়ার অনুমতি দেওয়ার পরে, সিগারেট আর খেতে ইচ্ছে করে না। লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ হতো। এখন আর সেটা পাই না।
    একদিন আমাদের পরিবারের একটি বিশেষ দিনে শহীদ ভাই আর নীরা আপাকে নিয়ে বাইরে খেতে গিয়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়ার পরে বিল এলে শহীদ ভাই নীরা আপাকে বললেন, ‘আরে, ওদের আজকে বিশেষ দিন, আমরা ওদেরকে ট্রিট করব। আমরা কেন সেটা করছি না?’ আমাদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ওঁরা সেদিন বিল মিটিয়েছিলেন। আর চমৎকার একটি কার্ডে দুজন লিখে দিয়েছিলেন। এসবই সুখস্মৃতি।
    আমার সব সময় মনে হতো শহীদ কাদরী কেন আত্মজৈবনিক কোনো লেখা লিখলেন না। বদ্ধুদেব বসুরআমার ছেলেবেলা, ‘আমার যৌবন-এর মতো! কাল ফোন করে নীরা আপাকে সে কথাটি জিজ্ঞেস করেছিলাম। শামসুর রাহমান যখন তাঁর আত্মজীবনীকালের ধুলোয় লেখালিখলেন, সেখানে শহীদ ভাইদের সঙ্গে আড্ডা এবং বিউটি বোর্ডিং নিয়ে কিছুই লেখেননি। এখন যদি শহীদ ভাই তাঁর আত্মজীবনী লেখেন তাহলে তো তার সবকিছুই তিনি লিখবেন। বন্ধুদের সকল কর্মকাণ্ড, কী বিউটি বোর্ডিং নিয়েও নানা কথা, বিশেষত তাঁর সব বন্ধুদের কথা। শহীদ ভাই বলেছিলেন, ‘নীরা, শামসুর রাহমান অনেক কিছু বলেননি, যা আমি বলব। তখন শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী অর্থহীন হয়ে যাবে! বন্ধু হিসেবে সেটা আমি করতে পারি না। আমি আত্মজীবনী লিখব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

    শহীদ ভাইয়ের একটি অন্তরঙ্গ ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম সেবার। রীতিমতো কাগজ-কলম নিয়ে। বলেছিলাম, আপনার ছেলেবেলার কথা শুনতে চাই। শহীদ ভাই বলতে শুরু করলেন , ‘জানো তো, আমার জন্ম কলকাতার পার্ক সার্কাসের দিলকুশা স্ট্রিটে, ১৯৪২ সালে। দেশভাগের পরে, ১৯৫২ সালে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় এসে বাংলাবাজারে ফুপুর বাসায় উঠেছিলাম। সদরঘাটে গিয়ে নৌকা দেখে পাগল হয়ে যাই ( হা হা হা করে হাসি) এই শহরে থাকলে রোজ রোজ নৌকা দেখতে পাব, এই ভেবে কলকাতা ছেড়ে আসার দুঃখ ভুলে যাই। আমাদের আদি দেশ গফরগাঁও। দাদার বাবারা ছিলেন দুই ভাই। ওঁদের মধ্যে জায়গাজমি নিয়ে বিরোধের ফলে এক ভাই সিরাজগঞ্জে চলে যান। অন্যজন কলকাতায়। আমার দাদা কলকাতায় পড়াশোনা করেন এবং ইংরেজি, অঙ্ক সংস্কৃত নিয়ে বিএ পাস করেন। তাঁর ক্লাসমেট ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। দাদির বাবা ছিলেন বড়লাটের সেক্রেটারি। দাদিরা সম্ভবত দিল্লির মেয়ে। বড়লাটের পার্সোনাল সেক্রেটারি ছিলেন দাদা। আমার দাদা তিরিশের দশকে ঢাকায় পোস্টেড ছিলেন। তখন পিতৃপুরুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। বাবার দিকের লোকজন পাওয়া যায় কি না। আদিপুরুষরা সিরাজগঞ্জ চলে গেছেন জানতেন। কিন্তু সেখানেও পাননি।

    শুনতে শুনতে কেমন নেশা ধরে যাচ্ছিল। শহীদ ভাই তাঁর ছেলেবেলার কথা, ভাই শাহেদ কাদরীর কথা বলতেন কী গভীর মমতায়! বলি,‘আপনাদের পরিবারের আরও অনেকে তো লেখালেখি করেন। তঁঁদের কথা শুনতে চাই।শোনো বলি, দাদির পরিবারে প্রচুর লোক ছিল। আবু রুশদ, রশীদ করিম আমার কাজিন। তাদের বড়ভাই তৈয়ব কবি বিষ্ণু দের কলিগ ছিলেন। এরা সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই। আর জামিল চৌধুরী, আনিস চৌধুরী সম্পর্কে আমার ফুফাতো ভাই। এই আনিস চৌধুরীই আমাকে লেখালেখিতে প্রথম উৎসাহ দেন। আনিস চৌধুরীকে আমরা ডাকতাম আনসু ভাই। আনিস, জামিল চৌধুরীর সবচেয়ে বড়ভাই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিলিয়া আলীর বাবা।
    অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। শরীরটাও বোধকরি ভালো লাগছিল ওঁর। তিরিশোত্তর কবিতা নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে বললেন, (শহীদ ভাই বাংলা সাহিত্য শুধু নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক।) ‘নিঃসঙ্গতার অর্থ এবং এর উপলব্ধি ওয়েস্টার্ন সাহিত্য থেকে শিখেছে বাঙালিরা। ওয়েস্টার্ন সাহিত্য থেকে এটাও শিখেছেযা সুন্দর, শুধু তাই নয়, সবকিছুই কবিতা হতে পারে। আমাদের আধুনিকতাপূর্ব কবিতা শুধু সৌন্দর্যকে এনেছে। সৌন্দর্যকেই বিষয়বস্তু করেছে। সেখানে আধুনিক কবিতা, সৌন্দর্যের সঙ্গে কদর্যতাকেও এনেছে। যে হাত হরিণের মতো প্রাণী তৈরি করেছে, সে বাঘের ভয়াবহতাকে তৈরি করল কীভাবে? যা অসুন্দর সেটাও শিল্পের বিষয় হতে পারে। আমি মনে করি, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় না পাওয়ার যে তীব্র আর্তনাদ, বাংলা কবিতায় শুধু নয়, বিশ্বকবিতাতেও তার নজির নেই।

    অবধারিতভাবে শামসুর রাহমানের প্রসঙ্গ এলে আমি একটু উসকে দিই। কিন্তু শহীদভাই সে ফাঁদে পা দেন না। অবশ্য আড্ডায় বন্ধুদের অনেক দুর্বলতা বা কৌতূহল-উদ্দীপক কথা বলে হো হো করে হাসতেন। আল মাহমুদকে নিয়ে তাঁর বিখ্যাত স্মৃতিচারণাটি আমার ধারণা এতদিনে সবাই শুনেছেন। আমি আর সে প্রসঙ্গে না বলি। বললেন, ‘শুরুতে শামসুর রাহমানের কবিতায় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না। উনিশশসত্তর সালে মওলানা ভাসানীর ভাষণ শুনে প্রথম শামসুর রাহমান রাজনৈতিক কবিতা লেখেন। কবিতাটির নামসফেদ পাঞ্জাবি তাই দেখে হাসান হাফিজুর রহমান খেপে গিয়েছিলেন শামসুর রাহমানের উপর। শামসুর রাহমান যখন রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হলেন, তখন তিনি ছিলেন দোদুল্যমান। পরে সেই দোদুল্যমানতা কাটিয়ে স্থিত হন। জানো তো, শামসুর রাহমান ছিলেন ফিকল মাইন্ডেড। ভাসানীপন্থি, চীনপন্থি, মস্কোপন্থি সবাই এসে তার সঙ্গে ফিসফিস করত। সবকিছুই তিনি বিশ্বাস করতেন। তবে শামসুর রাহমানই আমাকে বলেছিলেন, “শহীদ, বই বের করার জন্য ব্যস্ত হবেন না। প্রথম বই বেছে বের করবেন। পরে যা- করেন।শামসুর রাহমান আর শহীদ ভাই সমসাময়িক কিনা জিজ্ঞেস করলে বললেন, ‘শামসুর রাহমান আমার চেয়ে বেশ বড়। আমি যখন স্কুলে পড়ি, শামসুর রাহমান তখন ইউনিভার্সিটিতে। আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৫৬ সালে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে, সঞ্জয় ভট্টাচার্যেরপূর্বাশায়। কবিতার নামগোধূলির গান।এই কবিতাটি প্রকাশের ঠিকুজি ধরে সবাই আমাকে পঞ্চাশের কবিদের দলে ঠেলে দিয়েছে।একটু কি অভিমান ছিল শহীদ কাদরীর কণ্ঠে!
    এখনও কোনো বইয়ে নিইনি কবিতাটি।
    স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করছি, শোনো :
    জানি না ক্লান্তির আর্তি ছাড়া অন্য কোনো ধ্বনি ছিল কিনা সন্ধ্যার নদীর স্বরে।
    কে যেন মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করে কবেকার ভুলে যাওয়া নাম।
    ছেলেটি কি বোঝে?”
    আসলে চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই সব বোঝে এই ছেলেটি। নারী, প্রেম, নিঃসঙ্গতা। বন্ধুর বাবা-মায়ের মিলিত হওয়ার দৃশ্য দেখেছিলাম এখনও মনে আছে।
    একটু দুষ্টুমি করার জন্য বলি, ‘কী বুঝতেন শহীদ ভাই?’
    শহীদ ভাই তাঁর ভারী কণ্ঠস্বরকে একটু খেলিয়ে, হেসে বললেন, ‘সব বুঝতাম। সাত-আট বছর বয়স থেকে সব ধরনের ছবি দেখতাম। পর্নোগ্রাফি দেখতাম ছোটবেলায়।বলেই আবার সেই ঘর আলো করা উচ্চকণ্ঠের অকৃত্রিম হাসি। আমিও শহীদ ভাইয়ের হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হো হো করে হাসতে থাকি। হাসতে হাসতেই আমাদের কথা সেদিনের মতো শেষ হয়েছিল। তারপর আমি দেশে চলে এলাম। দেশে বসে শুনছি শহীদ ভাইয়ের শরীরটা ভালো নেই। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একদিন শুনলাম শহীদ ভাই আর সত্যি সত্যি নেই। আর কখনও দেখা হবে না।


    শহীদ ভাই দেশে এলেন। শহিদ মিনারে যখন দেখতে গেলাম, শুনতে পাচ্ছিলাম সবার হাহাকার। সেই এলেন- যদি, আমরা কেন আর তাঁর হাসি শুনতে পেলাম না, কথা শুনতে পেলাম না! একজন কবি যিনি নিজেই ছিলেন একটা ইনস্টিটিউশন। আরও কত কত কথা। শহীদ ভাই আর কিছুই জানলেন না। জানলেন না দেশের মানুষ শহীদ কাদরীকে কত ভালোবেসে মনে রেখেছে। মাইক্রেফোনে নানাজনে কথা বলছেন। এক সময় কবিকে নিয়ে যাওয়ার সময় হলো। কবির পরিবার থেকে সবার হয়ে একজনকে মাইক্রোফোনে গিয়ে শহীদ ভাই সম্পর্কে কিছু বলতে বলা হলে আমি পরম বিস্ময়ে শুনলাম, নীরা আপা উপস্থিতজনদের বলছেন, ‘আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলবেন মাহফুজা শীলু।হ্যাঁ, আমি তো পরিবারের একজনই ছিলাম। আর শহীদ কাদরীর মতো কবিদের পরিবার যে অনেক বড় হয় সেটা কে না জানে!
     http://www.alokrekha.com

    8 comments:

    1. রেহানা সুলতানাSeptember 6, 2019 at 4:41 PM

      বরেণ্য কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে লেখক মাহফুজা শীলুর "স্মৃতি " লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো। এই লেখায় প্রতীয়মান হয়েছে তিনি শুধু বড় মাপের একজন কবি ও লেখকই ছিলেন না। হাসি খুশি আনন্দ বেদনায় আত্মার আত্মীয় ছিলেন। লেখককে অনেক ধন্যবাদ তাঁর স্মৃতি আমাদের সাথে ভাগ করার জন্য।

      ReplyDelete
    2. মোহন সিরাজীSeptember 6, 2019 at 4:46 PM

      শহীদ কাদরী ছিলেন বাংলাদেশী কবি ও লেখক। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাঙালি কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করেছিলেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অভিব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ববোধ এবং প্রকৃতি ও নগর জীবনের অভিব্যক্তি তার কবিতার ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যেকে বৈশিষ্ট্যায়িত করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে তিনি ব্যবহার করেছেন তার কাব্যে। তার কবিতায় অনুভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।তাঁকে নিয়ে লেখক মাহফুজা শীলুর "স্মৃতি " লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো।

      ReplyDelete
    3. সেলিম রায়হানSeptember 6, 2019 at 5:09 PM

      বরেণ্য কবি ও লেখক শহীদ কাদরীকে নিয়ে লেখক মাহফুজা শীলুর "স্মৃতি " লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো। এখানে কবি ও লেখক শহীদ কাদরীকে নিয়ে লিখতে যেয়ে অনেক কিছু উঠে এসেছে। যেমন কবি শামসুর রহমান তাঁর লেখা সম্বন্ধীয় ব্যাপার ,ঐতিহাসিক বিউটি বঁর্ডিং ইত্যাদি। খুব সুন্দর ! ভালো থাকবেন। অনেক শুভেচ্ছা লেখক কে।

      ReplyDelete
    4. সাইদুজ্জামানSeptember 6, 2019 at 5:12 PM

      কবি ও লেখক শহীদ কাদরীকে নিয়ে লেখক মাহফুজা শীলুর "স্মৃতি " লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো।অনেক শুভেচ্ছা লেখক

      ReplyDelete
    5. নাসিমা হক খানSeptember 6, 2019 at 5:22 PM

      কিছু লেখা আছে পড়তে শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভালো লাগে না। লেখক মাহফুজা শীলুর লেখাটাও তেমনি। খুব ভালো লাগলো পড়ে। শব্দ চয়ন ,ভাব ভাষা অনেক সুপরিশোলিত মন কাড়া। অনেক ধোঁয়নাদ এমন একটা লেখার জন্য।

      ReplyDelete
    6. রায়হান খানSeptember 6, 2019 at 5:43 PM

      এখানে কবি ও লেখক শহীদ কাদরীকে নিয়ে লেখক মাহফুজা শীলুর নিজের কোথায় বেশি বলেছেন। উনি কতটা কাছের মানুষ ছিলেন। শহীদ কাদরীকে নিয়ে লেখা খুব কম। নেই বললেই চলে। অনেকটা আত্মবিকাশের মত। উনি যদি শহীদ কাদরীর কর্ম জীবনের উপর আলোকপাত করতেন তবে ভালো হত।

      ReplyDelete
    7. শফিক আজাদSeptember 6, 2019 at 7:37 PM

      "স্মৃতি " লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো। বরেণ্যএখানে কবি ও লেখক শহীদ কাদরীকে নিয়ে লিখতে যেয়ে অনেক কিছু উঠে এসেছে যা আগে আমাদের জানা ছিল না । অনেক ধন্যবাদ লেখককে। ভবিষ্যতে আরো লেখা পাবো এই আশায় থাকলাম। অনেক শুভেচ্ছা লেখক মাহফুজা শীলুকে ।

      ReplyDelete
    8. মাহবুব হাসানSeptember 6, 2019 at 7:48 PM

      "স্মৃতি " লেখাটা পড়ে অনেক ভালো লাগলো। বরেণ্যএখানে কবি ও লেখক শহীদ কাদরী নয়। বন্ধুত্ব ,আতিথ্যেয়তা পারিবারিক জীবনের ঝলক দেখা যায়। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।

      ReplyDelete

    অনেক অনেক ধন্যবাদ