আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও -আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও-যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে..আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে..এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও..আমার পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান-তার নাইকো বাণী নাইকো ছন্দ নাইকো তান..তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁইয়ে দাও তেজ -----------দেবব্রত সিংহ ~ alokrekha আলোক রেখা
1) অতি দ্রুত বুঝতে চেষ্টা করো না, কারণ তাতে অনেক ভুল থেকে যায় -এডওয়ার্ড হল । 2) অবসর জীবন এবং অলসতাময় জীবন দুটো পৃথক জিনিস – বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন । 3) অভাব অভিযোগ এমন একটি সমস্যা যা অন্যের কাছে না বলাই ভালো – পিথাগোরাস । 4) আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও , আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব- নেপোলিয়ন বোনাপার্ট । 5) আমরা জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহন করি না বলে আমাদের শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না – শিলার । 6) উপার্জনের চেয়ে বিতরণের মাঝেই বেশী সুখ নিহিত – ষ্টিনা। 7) একজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি আরেকজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি কে জাগ্রত করতে পারে না- শেখ সাদী । 8) একজন দরিদ্র লোক যত বেশী নিশ্চিত , একজন রাজা তত বেশী উদ্বিগ্ন – জন মেরিটন। 9) একজন মহান ব্যাক্তির মতত্ব বোঝা যায় ছোট ব্যাক্তিদের সাথে তার ব্যবহার দেখে – কার্লাইন । 10) একজন মহিলা সুন্দর হওয়ার চেয়ে চরিত্রবান হওয়া বেশী প্রয়োজন – লং ফেলো। 11) কাজকে ভালবাসলে কাজের মধ্যে আনন্দ পাওয়া যায় – আলফ্রেড মার্শা
  • Pages

    লেখনীর সূত্রপাত শুরু এখান থেকে

    তেজ -----------দেবব্রত সিংহ


    তেজ -দেবব্রত সিংহ


     ‘মু জামবনির কুঁইরি পাড়ার শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি বটে।’
    কাগজওয়ালারা বইললেক,
    “উঁ অতটুকু বইললে হবেক কেনে?
    তুমি এবারকার মাধ্যমিকে পত্থম হইছ।
    তোমাকে বইলতে হবেক আরো কিছু।”
    পঞ্চায়েতের অনি বৌদি, পধান, উপপধান, এইমেলে, এম.পি-
    সব একেবারে হামলিয়ে পড়ল আমাদের মাটির কুঁইড়েঘরে।

    জামবনি ইস্কুলের হেডমাস্টার
    কোন বিহান বেলায় টিনের আগর খুইলে,
    হেইকে, ডেইকে, ঘুম ভাঙাই- খবরটা যখন পথম শুনালেক
    তখন মাকে জড়াই শুয়ে ছিলুম আমি।
    কুঁড়াঘরের ঘুটঘুইটা আঁধারে হেডমাস্টার মশাইরে দেইখে
    চোখ কচালে মায়ের পারা আমিও হাঁ – হয়ে ভাইবে ছিলেম।
    -একি স্বপন দেখছি নাকি-
    স্যার বইলল, এটা স্বপুন লয়, স্বপুন লয়, সত্যি বইটে।
    কথাটো শুইনে কেঁইনদে ভাসায়েছিলুম আমরা মা বিটি।
    বিজ্ঞাপন
    আজ বাপ বেঁইচে থাইকলে
    আমি মানুষটাকে দেখাইতে পাইত্থম। দেখাইতে পাইতত্থেম বহুত কিছু-
    আমার বুকের ভিতর
    যে তেজালো সইনঝা বাতিটা জ্বালায়ে ছিল মানুষটা।
    সেই বাতিটা আজকে কেমন আমাদের কুঁইড়ে ঘরটাকে আলো কইরেছে।
    সেটো দেখাইতে পাইত্থম।
    আপনারা বইলছেন বটে
    “তুমাদের মতো মেইয়ারা যদি উঠে আসে তবে ভারতবর্ষ উঠে আসে।”
    কথাটা খুবই সত্যি, কিন্তু
    উঠে আসার রাস্তাটা যে এখোন তৈয়ার হয় নাই।
    খাড়া পাহাড়ে উঠা যে কি জিনিস।
    বহুত দম লাগে। বহুত ত্যাজ লাগে…
    আমি জামবনির কুঁইরি পাড়ার শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি।
    যখন থেকে হুঁশ হইছে তখন থেকে শুইনে আসছি
    “বিটি না মাটি’
    ঠাকুমা বইলথক্,
    পরের ঘরে হেঁইসেল ঠেইলবেক্ তার আবার লিখাপড়া’
    গাঁয়ের বাবুরা বইলথক্
    “দ্যাখ সাঁঝলি – মন খারাপ কইরলি তো হেইরে গেলি।
    শুন যে যা বইলছে বলুক্। সে সব কথা এক কানে সিধালে
    আর এক কানে বার কইরে দিবি।’
    তখ্যান বাবুপাড়ার দেঘইরা ঘরে কামিন খাইটতক মা।
    ক্ষয় রোগের তাড়সে-মায়ের গতরটা ভাঙে নাই অতোটা।
    মাঝে মইধ্যে জ্বরটর আইত বটে, জ্বর এলে মা
    চুপচাপ এঙনাতে তালাই পাইতে শুইয়ে থাইকতো।
    মনে আছে সে ছিল এক জাঁড় কালের সকাল।
    রোদ উঠেছিল ঝলমলানি ঝিঙা ফুলা রোদ।
    আমি সে রোদে পিঠ দিয়া গা দুলাই পড়ছিলাম
    ইতিহাস…
    কেলাস সেভেনের সামন্ত রাজাদের ইতিহাস।
    দে ঘরের গিন্নি লোক পাঠাইছিল বারকতক।
    মায়ের জ্বর সে তারা শুইনতে নাই চায়!
    আমাদের দিদি বুঢ়ি তখনো বাঁইচে।
    ছেঁড়া কম্বল মুড়হি দিয়ে বিড়ি ফুকছিল বুড়হি।
    শেষতক্ বুড়হি সেদিন পড়া থেকে উঠাই
    মায়ের কাইজ টুকুন কইরতে পাঠাই ছিল বাবু ঘরে।
    পুরানো ফটক ঘেরা উঠান-অতোবড়ো দরদালান- অতোবড়ো বারান্দা,
    সব ঝাঁট ফাট দিয়ে সাফ সুতরো করে আসছিলুম চইলে,
    দেঘইরে গিন্নি নাই ছাইড়ল্যাক, একগাদা এটাকাটা-জুঠা বাসন
    আমার সামনে আইনে ধইরে দিলেক। বইল্লুম
    “আমি তোমাদের জুঠা বাসন ধুইতে লাইরবো,”
    বাবু গিন্নির সেকি রাগ’-
    “কি বইল্লি তুই যতবড়ো মু লয় তত বড়ো কথা? জানিস,
    তর মা, তর মায়ের মা, তার মায়ের মা সবাই এতক্কাল
    আমাদের জুঠা বাসন ধুয়ে গুজারে গ্যালো
    আর তুই আমাদের জুঠা বাসন ধুইতে লাইরবি!”
    বল্লুম “হ আমি তোমাদের জুঠা বাসন ধুইতে লাইরবো।
    তোমরা লোক দেখে লাওগা। আমি চইল্লোম”
    কথাটো বইলে গটগট গটগট কইরে বাবু গিন্নির মুখের সামনে
    আমি বেড়োই চইলে আইলম।”
    তা বাদে সে লিয়ে কি কাইন্ড। কি ঝাম্যালা।
    বেলা ডুবলে মাহাতোদের ধান কাট্টে বাপ ঘরে ফিরে আইলে
    দুপাতা লিখাপড়া করা লাত্নির ছোট মুখে বড়ো থুতির কথা
    সাতকাহন কইরে বইলেছিল বুড়হি দিদি।
    মা কুনো রা কাড়ে নাই।
    আঘর মাসের সইন্ ঝা বেলাই এঙ্গ্নাতে আগুন জ্বেইলে
    গা-হাত-পা সেঁকছিল মা।
    একমাথা ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকানো বাপের পেটানো পাথরের মুখটা
    ঝইলকে উঠেছিল আগুনের আঁচে।
    আমি বাপের অমুন চেহারা কুনোদিন দেখি লাই।
    বাপ সেদিন মা আর দিদি বুড়ির সমুখে আমাকে কাইছে ডেইকে
    মাথায় হাত বুলাই গম্ গইমা গলায় বইলেছিল –
    যা কইরেছিস্! বেশ্ কইরেছিস্।
    শুন্, তর মা, তর মায়ের মা, তার মায়ের মা- সবাই কইরেছে কামিনগিরি।
    বাবুঘরে গতর খাটাই খাইয়েছে। তাইতে হইছে টা কি।
    তাতে হইছে টা কি! ই-কথাটো মনে রাখবি সাঝ্লি,
    তুই কিন্তু কামিন হবার লাগে জম্মাস লাই।
    যত বড় লাট সাহেবই হোক কেনে কারু কাছে মাথা নোয়াই
    নিজের ত্যাজ বিকাবি লাই।
    এই ত্যাজ টুকুর ল্যাইগে লিখাপড়া শিখাচ্ছি তুকে।
    না হলে আমাদের মতো হা-ভাতা মানুষের ঘরে আর আছে টা কি?”
    আমি জামবনির কুইরি পাড়ার শিবু কুইরির বিটি সাঁঝলি,
    কবেকার সেই কেলাস সেভেনের কথা ভাবতে যায়ে
    কাগজওয়ালা টিভিওয়ালাদের সামনে এখুন কি যে বলি…
    তালপাতার রদ দিয়ে ঘেরা গোবুর লতার এঙ্গনাতে লুকে এখন লুকাকার।
    তার মাঝে বাঁশি বাজাই, জিপগাড়িতে চেইপে
    আগুপিছু পুলিশ লিয়ে মন্ত্রী আইল্যাক ছুটে।
    ‘কুথায় সাঁঝলি কুইরি কুথায়’, বইলতে বইলতে
    বন্দুকধারী পুলিশ লিয়ে সুজা আমাদের মাটির কুইড়ে ঘরে,
    হেডমাস্টার বইললে ‘পনাম কর, সাঁঝলি পনামকর’
    মন্ত্রী তখন পিঠ চাপড়াইল্যাক। পিঠ চাপরাই বইল্লেক,
    “তুমি কামিন খেইটে মাইধ্যমিকে পথম হইছ,
    তাই তুমারে দেইখতে আইলম্, সত্যিই বড় গরীব অবস্থা বটে।
    তুমাদের মতো মিয়ারা যাতে উঠে আসে
    তার লাগেই তো আমাদের পার্টি, তার লাগেই তো আমাদের সরকার।
    – এই লাও, দশ হাজার টাকার চেকটা এখুন লাও।
    শুন আমরা তুমাকে আরো ফুল দিব, সম্মর্ধ্বনা দিব,
    আরো দ্যাদার টাকা তুলে দিব।–
    এই টিবির লোক, কাগুজের লোক, কারা আছেন, ই-দিকে আসেন।“
    তক্ষুনি ছোট বড় কতরকমের সব ঝইলকে উঠল ক্যামেরা,
    ঝইলকে উঠল মন্ত্রীর মুখ। না না মন্ত্রী লয়, মন্ত্রী লয়,
    ঝইলকে উঠল আমার বাপের মুখ।
    গন্ গনা আগুনের পারা আগুন মানুষের মুখ।
    আমি তক্ষুনি বইলে উঠলম-
    “না না ই টাকা আমার নাই লাইগব্যাক। আর আপনারা
    যে আমায় ফুল দিব্যান, সম্মর্ধ্বনা দিব্যান বইলছেন তাও আমার নাই লাইগব্যাক।’
    মন্ত্রী তখন ঢোক গিলল্যাক।
    গাঁয়ের সেই দেঘইর‍্যা গিন্নির বড় ব্যাটা এখুন পাটির বড় ল্যাতা।
    ভিড় ঠেলে সে আইসে বইলল্যাক-
    “ ক্যানে, কি হইছেরে সাঁঝলি,
    তুই তো আমাদের বাড়ি কামিন ছিলি।
    বল তর কি কি লাইগব্যাক, বল, তর কি কি লাইগব্যাক খুলে বল খালি,”
    বইল্ লম –
    “ আমার পারা শয়ে শয়ে আর অনেক সাঁঝলি আছে।
    আর শিবু কুইরির বিটি আছে গাঁ গিরামে। তারা যদ্দিন
    অন্ধকারে পইড়ে থাইকবেক তারা যদ্দিন লিখ-পড়ার লাগে কাঁইদে বুলব্যাক্।
    তদ্দিন কুনো বাবুর দয়া আমার নাই লাইগব্যাক্। শুইনছ্যান আপনারা
    তদ্দিন কুনো বাবুর দয়া আমার নাই লাইগ্ ব্যাক।“

    http://www.alokrekha.com

    4 comments:

    1. মীনাক্ষী সেনNovember 13, 2019 at 1:56 PM

      লোক কবি দেবব্রত আমার খুব প্রিয় কবি। তেজ কবিতায় সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কথা উঠে এসেছে। সাঁঝলি'র জীবনের মাধ্যমে তিনি লোক মানুষের জীবন গাঁধা তুলে ধরেছেন। অনেক ভালোবাসা কবি।

      ReplyDelete
    2. অমৃত চ্যাটার্জিNovember 13, 2019 at 2:10 PM

      লোক কবি দেবব্রত সিংহের তেজ আমার খুব প্রিয় কবিতা । তেজ কবিতায় সাঁঝলি'র জীবনের মাধ্যমে তিনি অংকিত করেছেন সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কথা।সাঁঝলি একটা প্রতিবাদী কণ্ঠ তার শেষ কথাগুলো বুকের মধ্যে যেয়ে লেগেছে। অনেক ভালো বাসা আমার প্রিয় কবিকে। ভালো থাকুন।

      ReplyDelete
    3. প্রদীপ কুমার সাহাNovember 13, 2019 at 2:17 PM

      লোক কবি দেবব্রত সিংহের তেজ আমার খুব প্রিয় কবিতা । “ আমার পারা শয়ে শয়ে আর অনেক সাঁঝলি আছে।
      আর শিবু কুইরির বিটি আছে গাঁ গিরামে। তারা যদ্দিন
      অন্ধকারে পইড়ে থাইকবেক তারা যদ্দিন লিখ-পড়ার লাগে কাঁইদে বুলব্যাক্।
      তদ্দিন কুনো বাবুর দয়া আমার নাই লাইগব্যাক্। শুইনছ্যান আপনারা
      তদ্দিন কুনো বাবুর দয়া আমার নাই লাইগ্ ব্যাক।“ কি দুর্দান্ত প্রতিবাদী কথা গুলো। কবি দেবব্রত সিংহের সবগুলো কবিতায় এই ধরণের কথা থাকে। খুব ভালো বিপ্লবী কবিতা।

      ReplyDelete
    4. খুব সুন্দর লেখা যদিও আমরা যারা বাংলাদেশের তাদের জন্য এই গদ্য কবিতার অনেক শব্দ নতুন আর আমাদের গ্রামাঞ্চলে ব্যবহার হয়না. পশ্চিম বঙ্গের অনেক কবিতা পড়েছি যেখানে এই ভাষা পেয়েছি. কবি দেবব্রত সিংহকে বাংলাদেশ থেকে শুভেচ্ছা. ভালো থাকুন.

      ReplyDelete

    অনেক অনেক ধন্যবাদ