"মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান,
আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার।
আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।।
আমারে তলব দিও দ্যাখো যদি দুঃখের কাফন
তোমারে পিন্ধায়া কেউ অন্যখানে যাইবার চায়
মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন,
অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এত সুখ পায়? ……
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয় …
…… এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।"
আমার মনের সব অবদমিত যন্ত্রণার কথা এভাবেই যেন সৈয়দ শামসুল হক ‘পরাণের গহীন ভিতর’ এ লিখে গেছেন। তিনি বোধহয় জানতেন তোমার মতো মানুষেরা ভালোবাসাকে নির্দ্বিধায় চাঁদের আলোর মতো বিলিয়ে দেয়, আর আমার মতো মানুষেরা বেঁচে থাকে ভালোবাসাকে ধারণ করবার জন্য। চলে যাবার জন্য তোমায় ভালোবাসিনি; জানতে, আমার কাছে তোমার জন্য ভালোবাসা কোনো অনিন্দ্যসুন্দর চাঁদের আলো ছিলে না যে মিলিয়ে যাবে। বোকা, হৃদয়সর্বস্ব আমি, তোমায় যুগ যুগান্তর ধরে খুঁজে ফিরেছি সব গল্পের মধ্যে, সব কবিতার আলো আধারিতে, বার বার খুঁজে পাবার নেশায় আর আবিষ্কারের চেষ্টায় মত্ত থেকেছি।
চে’গুয়েভারার উপর লেখা বইটা প্রথম দিন তোমার লাইব্রেরি থেকে নেইনি, তবে তুমি চলে যাবার পর ওকে নিয়ে অনেক বই পড়েছি আর তোমায় আবিষ্কার করেছি চিরসবুজ, চিরবিপ্লবী চে ‘এর মধ্যে। সেই যে বলেছিলাম, তুমি চলে যাবার পর তোমার প্রিয় জিনিসগুলির মধ্যে তোমায় খুঁজে নিতাম। একটা মজার ঘটনা পড়ছিলাম আলডা মার্চের লেখায়। চেগুয়েভারার স্ত্রী, আলডা মার্চ, তার স্বামীর মৃত্যুদণ্ডের ৪৫ বছর পর স্মৃতিকথা, ‘For the love of Che’ লিখেছিলো। ওদের প্রথম পরিচয় ১৯৫৮' র নভেম্বরে যখন আলডা গুপ্ত কর্মী হিসেবে চে'র গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেয়। ফিদেল কাস্ত্রোর সামরিক কমান্ডার হয়ে, চে' তখন একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তার উৎখাত এর জন্য কিউবার বিপ্লবে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো।
আলডা লিখছে, “সময়টা আমাদের জন্য খুব উৎকণ্ঠার ছিল কেননা আমরা সারাক্ষন কোনো না কোনো বিপদ বা দুর্ভাবনা নিয়ে মানসিক চাপে থাকতাম। ঠিক সেই সময়ে, নিজেকে প্রকাশ করবার জন্য চে' বেছে নিয়েছিল ওর জানা সবচেয়ে সুন্দর উপায়গুলির মধ্যে একটি। চে’ আমার জন্য কবিতা আবৃত্তি করবার একটা উপায় বের করে নিয়েছিল। আমি কারখানার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, ঠিক তখুনি, হঠাৎ পিছন দিক থেকে, চে’ জোরে জোরে একটি কবিতা আবৃত্তি শুরু করল। কবিতাটা আমি জানতাম না। যেহেতু আমি অন্যদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম, এটা আমার প্রতি ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করার একটা উপায় ছিল। চে' চাচ্ছিলো আমি ওকে লক্ষ্য করি একজন নেতা কিংবা আমার ঊর্ধ্বতন হিসেবে নয়, বরং একজন পুরুষ হিসেবে। চে’ কেবল একজন সাধারণ পুরুষ হয়ে, আমার মতো একজন সাধারণ মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছিলো।”
পৃথিবীর সব ভালোবাসার গল্পগুলি কি এক হয় ? তখন সবে তোমার সাথে আমার নতুন পরিচয়, ক্লাস করতে ক্যাম্পাস এ ঢুকছি মাত্র দেখলাম একদল ছেলেপুলে নিয়ে তুমি বসে আছো। জানতে আমি ক্লাস এ আসবো, আমাকে হেটে আসতে দেখেই জোরে জোরে গলা ছেড়ে গান শুরু করে দিলে ! মনে হচ্ছিলো পাড়ার কোনো মাস্তান তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বসে আছে তার প্রেমিকার আগমনের অপেক্ষায়। মনে মনে ভীষণ হাসলাম । বুঝতে পেরেছিলাম ওটা ছিল আমার প্রতি তোমার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য একটা পাগলামি মাত্র, ঠিক যেমনটা চে' করেছিল। You were falling in love with me, irrespective of not wanting to fall in
love but there was an invisible pull that couldn't be stopped. It was like the
entire universe was conspiring to bring our souls together, souls that were
destined to meet, after centuries of separation.
চাঁদের আলো তোমার জন্য মিলিয়ে যায় হয়তো, কিন্তু আমার জন্য মিলায় না। এখানেই আমাদের চূড়ান্ত অমিল। পৃথিবীতে তোমার মতো মানুষেরা বিজয়ী হয় কারণ তারা সব কিছু খুব স্বাভাবিক ভাবে নেয়। একারণেই পৃথিবীর বড় বড়ো বিপর্যয়ে, বিভীষিকাময় গণহত্যায়ও মানুষ কেমন নিশ্চুপ থাকে, মানুষ সবকিছু মানিয়ে নেয়। আগে বুঝতাম না, এখন বুঝি। তাই হয়তো তোমার মতো মানুষদের কাছে - like a beautiful moonlight, love is destined to be vanished away !
নিলিশ্বরী,
২০’শে মার্চ ২০১৭,
ধানমন্ডি, ঢাকা
প্রিয় মেঘহরিণী,
"চলে গেলে- তুবু কিছু থাকবে আমার: আমি রেখে যাবো ….
তুমি নেমে গেলে এই বক্ষতলে সমস্ত কি সত্যিই ফুরোবে ? ….
আমার আঙ্গুলগুলি, আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি, অভিলাষগুলি ?
জানি কিছু চিরকাল ভাস্বর উজ্জ্বল থাকে, চির অমলিন !
তুমি চলে গেলে তবু থাকবে আমার তুমি, চিরায়ত তুমি !
অনুপস্থিতি হবে আমার একলা ঘর, আমার বসতি ! ….
উঠানে জন্মাবো কিছু হাহাকার, অনিদ্রার গান-
আর লোকে দেখে ভাববে- বিরহবাগান ঐ উঠানে তো বেশ মানিয়েছে !" তোমার প্রিয় আবুল হাসান থেকে।
অভিমানী মেয়ে। এখনো সেই আগের মতো অভিমানী তুমি। যেন পরিষ্কার দেখতে পেলাম ছলোছলো চোখের সেই তুমি এখনো বড়ো হওনি। তিন কন্যার অভিমানী মা, লাবণ্য আর নন্দিনী হয়ে তাই হয়তো তুমি চিরকালের অভিমানী রয়ে গেলে। আমি বলেছিলাম কথাটা আমার stoic ভাবনা থেকে, কিন্তু তুমি উত্তর দিলে তোমার হৃদয়সর্বস্ব মন দিয়ে। ঠিক বলেছো, আসলেই বসন্ত কি ফুরোয় ? নাকি বসন্ত রয়ে যায় সব ফুরোনোর পর নতুন করে আবার ফিরে আসবার জন্যে!
তোমার লেখা সেই প্রথম চিঠিটা পেয়েছি, ১৯ বছর আগে লেখা। The moonlight still glows in my sky, the same way it used to glow decades
ago. Does this help? Does this truth help the pain you still carry in your
fragile, humane heart ?
শুভাশীষ,
২৬’শে এপ্রিল ২০১৭,
টাওয়ার হিল, লন্ডন
শুভ,
লিখেছিলাম তুমি চলে যাবার কিছুদিন আগে ; বুঝতে পেরেছিলাম তুমি থাকবে না। তুমি বলেছিলে চিঠিটার উত্তর দেবে, কিন্তু দাওনি কখনো।
এই তিমির রাতে, রোদন ভরা বেদনার ধারাপাতে তুমি যেন আমায় গভীরতম প্রার্থনায় ঢেকে দিলে। আমায় অবাক করে তুমি রেখে দিয়েছিলে আমার চিঠিটা ! কথার জাদুগর তুমি, ঠিক বলেছো it healed my broken soul কিছুটা হলেও। জানো, আজকে মেঘে মেঘে ঢাকা কৃষ্ণ কালো আাকাশ, কোথাও কেউ নেই। কথা দাও, যেদিন আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো, খুলে দেখবে আমার চিঠিগুলি। অতন্দ্র প্রহরীর মত এগুলো যেন তোমায় মনে করিয়ে দেয় আমি ছিলাম, আমি ভালোবেসেছিলাম।
সক্রেটিসকে এথেন্সের আদালত যুবকদের বিপথগামী আর গ্রিক দেবতাদের অস্বীকার করবার অভিযোগে হেমলক পানে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। মৃত্যুর সময় সক্রেটিস তার শিষ্য ক্রেটোকে তার শেষ ইচ্ছের কথা বলেছিলো।
When Crito asked, “In what way
shall we bury you, Socrates?”
Socrates answered, “In any way
you like, but first catch me; the real me …. say that you are burying my body
only, and do with it whatever is usual and what you think is best.” Socrates
instructed Crito to only bury the physical corpse, emphasizing the soul's
freedom and transcendence beyond death - something that I want you to remember
too.
তুমি কি আমার ‘real me’ কে এখনো ধরতে পেরেছো?" আমার আসল আমি যে আমার প্রকৃত সত্ত্বা, আমার নিছক ক্ষয়ী নশ্বর দেহ নয়। তুমি কি আমার 'আসল আমি', আমার প্রকৃত সত্ত্বাকে এখনো চিনতে পেরেছো, ছুতে পেরেছো?"
“ভেজা মাটির নিকোনো ঘরটা এখন তৈরী হচ্ছে।
পশলা পশলা বৃষ্টি এসে সেটাকে বার বার ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
কালরাতে মনিটরের সব বক্ররেখাগুলো একসময় সরল হয়ে গেলো
কাঁচঘরের এপারে ছিলাম আমি- ওপারে তুমি, তোমরা সবাই।
জীবনের সব কঠিন সমস্যাগুলো যেন এক নিমেষে সমাধান হয়ে গেলো।
সত্যি সত্যি কোনো miracle আমায় আর জাগিয়ে রাখলো না।
মনে আছে, miracle আর বিশ্বাসের গল্পগুলো তোমায় আমিই বলতাম।
পশলা পশলা বৃষ্টিতে সযতনে তুমি আমার শরীরখানা নামিয়ে দিও।
আমায় শুইয়ে দিও ভেজা মাটির নতুন ঘরে. শুভ্রতার উপর
আমার মাথায় হাত রেখো; হাত রেখো তোমার আশির্বাদে;
শেষ বারের মতো হাত রেখো ভালোবাসায় আর অভিমানে।
তুমি কি থাকতে পারো আজ রাতে?
একটা বিনিদ্র রাত্রিতে তুমি কি পারোনা আমার পাশে জেগে বসে থাকতে?” - লিখেছিলাম ‘কাঁচঘর’ যুগ যুগান্তর আগে, তোমায় ভেবে ভেবে ….
নিলিশ্বরী,
২১’শে মে ২০১৭,
ধানমন্ডি, ঢাকা
নিলি,
আচ্ছা, তোমার সব কবিতাই কি কষ্টের? কাঁচাঘর ‘এ কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই।
আমি তোমায় অপমান করে, অপদস্থ করে, চলে গিয়েছিলাম কিন্তু তারপর আমি কেমন ছিলাম সেটা কখনো জানতে চাওনি। আমি শুধু শান্তি খুজতাম এই ক্ষুন্নিবৃত্তির জীবনে, অবিনশ্বরকে ডাকার তৌফিক চাইতাম। সব হারিয়ে শুধু একা থাকতে চাইতাম আর বলতাম, “আর কারো পানে চাহিব না। তোমায় হ্রিদ মাঝারে রাখবো যেতে দেব না।” আমি কোনদিন আমার রবের কাছে প্রার্থনা করে নিরাশ হবোনা জানতাম, কেননা ওটা তো তিনি বার বার পবিত্র গ্রন্থে বলেছেন।
তোমাকে বার বার ভয়ানক অবজ্ঞাভরে তাড়িয়ে দিয়েছি, তারপর উৎসবে মেতেছি, কত জনের সাথে, কত ভাবে, কেননা আমাকে পূরণ করতে হতো এক ভয়ানক শূন্যতা। To fill the void that was
inside my broken soul and which couldn't be filled even with multiple, bizarre
performances that I constantly performed. Sometimes I intentionally showed you
the things I did because I knew it would kill you viciously. I wanted to
destroy you and your humble fragile soul. I wanted to crush you so that you
stay away from the dark dark man that I was. I faked to be an agnostic; I was a
self declared sinner who believed nothing is sacred, holding that dogma as
sacred.
দিনেরবেলা মুখ বুজে পড়ে থাকতাম কাজের মধ্যে যেখানে ছুটি নেওয়া ছিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ। পন করেছিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই থাকবো। কে রাজা, কে রানী, কে মন্ত্রী, কে সান্ত্রী, ওসব নানাবিধ পার্থিব বিষয়ে আমার কিছু এসে যেত না। যদিও ক্ষমতার সাফল্য চাইতাম কিন্তু অবচেতনে সেই একই শূন্যস্থান পূরণ করবার জন্য। Antidote for the poison that was running in my veins. আমি যেমন শুন্য হয়ে গেছিলাম, তেমনি ছায়াহীন হয়ে থাকতাম। এতো কিছুর পরও তুমি আমার মতো misfit এর জন্য অপরিহার্য হয়ে রইলে। এমন একজন misfit যে ছিল circle in a square box, the
swimmer against the tide.
I was learning not to flinch
and kept on redeeming myself from the constant sin. I couldn't come out of my
stoic sorrow or self pity of feeling like the child of a lesser God. It was
taking me a lifetime to fathom what was going on! I was in a crusade to mend my
broken wings. আমি লিখতাম, পড়তাম, গান গাইতাম, কখনো জোরে জোরে, কখনো আনমনে, কখনো ঘরের কোনে একলা বসে। তারপর একদিন কোনো এক ভীষণ ঘটনায় আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, প্রচন্ড বিশ্বাসে, শান্ত হয়ে -অবিনশ্বর কে প্রশ্ন করলাম - আমি কি আবার নতুন করে সব শুরু করতে পারি ? A saint has a past and a sinner has a future.
কে তুমি, হাজার ক্রোশ দূরে, শত সমুদ্র পেরিয়ে, দাঁড়িয়ে আছো বিষাদের অভয়ারণ্যে, শূন্য হাতে, শূন্য হৃদয়ে আমার জীবনের গল্পগুলো শুনে যাচ্ছ ! "যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে / সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,..... তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।” রবিঠাকুর তার 'দুঃসময়' কবিতায় মনে করিয়ে দেয় সন্ধ্যা নেমে এলেও আর সব গান থেমে গেলেও, পাখি কখনোই ডানা বন্ধ করে না অর্থাৎ আশা হারায় না। আমরা দুজন যেন জীবনের উপর এমনি ভাবে আশা না হারাই । তুমিও যেন আর মন খারাপের কবিতা না লেখো , জীবন নিয়ে কোনো অনুশোচনা না করো। আমি যেন তোমার কাছে জীবন নিয়ে সুন্দর সুন্দর আশার কবিতা আর গল্প শুনতে পারি। ভালো থেকো প্রিয় মেঘহরিণী, কিশোরবেলার সেই হরিণী।
শুভাশীষ,
২৬’শে জুন ২০১৭,
টাওয়ার হিল, লন্ডন
আমার জার্মান চকলেট,
"তুমি যখন হাসো আর হাতের উপর হাত রেখে আশ্বাস দাও
আরো নরম হয়ে বলো সব ঠিক হয়ে যাবে
তখন মনে হয় ঈশ্বর এইবার ঘুম থেকে উঠে
প্রথমেই আমার দিকে তাকাবে" - দেবব্রত মুখোপাধ্যায় echoes in my heart, striking a chord deep within. তুমি এমন করে আমায় আশ্বাস দাও, আমায় শান্তি দাও - আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই।
সত্যি বলতে, জীবনের অনেক কিছু নিয়েই অনুশোচনা আমার, যার তালিকা বেশ দীর্ঘ। অনুশোচনা এ কারণেই যে কোনো কিছুই সময় মতো করতে পারিনি। এখনো আমি না ঘরের না ঘাটের। না শ্বশুরকুলের, না মায়েরকুলের। এখনো একটা ঘোরের মধ্যে বেঁচে আছি। চিরকুমারীর মতো পিতৃগৃহে যেন অনন্ত বাস আমার। আসলে আমার মতো মানুষেরা জগতের জন্য, সংসারের জন্য ঠিক নয়। আমরা বাউল প্রকৃতির। মেরিলিন মনরোর স্বামী আর্থার মিলার যেমন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন নিজেকে ‘misfit’ হিসেবে। আমার মতো misfit দলের মানুষেরা মৃত্যু অবধি হন্য হয়ে ঘুরে বেড়ায়; our hollow recluse soul
drifts around restless; we wander around aimless। আমরা মৃত্যু অবধি পালিয়ে বেড়াই জীবনের নিঃছিদ্র পৌনঃপুনিকতা আর পাহারা থেকে।
অনুশোচনা করি দেখে ভেবোনা আমি শুধুই দুঃখী, পরাজিত এক মা। সত্যিটা হলো আমি জানি আমি ভীষণ রকম বিজয়ীও বটে, বিজয়ী ওদের পেয়ে। আমর স্নেহের আত্মজ, আত্মজাদের পেয়ে, ওদের আলোধোয়া মুখ দেখে। তোমার ছেলেদের ও পেলাম জীবনের এই গোধূলিবেলায়। এও কি কম পাওয়া? আমার সন্তানেরা আমায় বেঁধে রাখে মায়ার বাঁধনে। কি সরল, নিষ্পাপ, আলোয় ধোয়া মুখ ওদের সবার। আমার ভাঙা ঘরে ওরা স্নিগ্ধ, সদ্যস্নাত, পবিত্র গোলাপ গুচ্ছ। আসল ব্যাপার হচ্ছে, লিখতে বসে একদণ্ডও বানিয়ে লিখতে পারিনা। আমি আসলেই একজন ভীষণ আবেগী, হৃদয়সর্বস্ব, ভাঙাচোরা মা। আমার এ পর্যন্ত যাপিত জীবন সত্যি বিচিত্র, বর্ণাঢ্য। এ জীবনে আছে জয় এবং পরাজয়। সুখ, উল্লাস এগুলোও আছে তবে খন্ড, বিক্ষিপ্ত,আর সাময়িক। জীবন নিয়ে অসম্ভব কান্না আছে আমার- সীমাহীন কান্না- আর আছে চরম নিস্তব্ধতা। সব কান্না আর নিস্তব্ধতা তোমায় ভালোবেসে পাইনি বলে। পিকাসোর মতো আমিও খানিকটা জানি কি করবো, খানিকটা জানিনা। এইযে এখন লিখছি তোমায়, তাড়িত হয়েই লিখছি। মন চাইছে, স্রেফ তাই লিখছি: স্বপ্ন, বাস্তব, পরাবাস্তব সব এলোমেলো ভাবনার মিলনমেলা।
একটা মজার কথা বলি, এখন আমার ভীষণ রকমের অন্তর সন্ধান চলছে। ভেতরে ভেতরে আমি পরিণত হচ্ছি বোধহয়। বুঝছি, আমি ভুবনেশ্বর কে ধারণ করা শিখছি, 'তোমাতে করিব বাস/ দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস'। ঠিক যেমনটা তুমি আগের চিঠিতে একদিন লিখেছিলে। সত্যি বলতে তোমার সেই মেঘবালিকা, তোমার সেই নিস্তব্ধ নিলিশ্বরী যুগ যুগান্তর পর তোমার চিঠিগুলো পেয়ে, আবার যেন নতুন করে শান্তির খোঁজ পেলো।
“আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রাতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে য্যান শুরু হয় বৃক্ষের রোপণ,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে বহুদিন ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর
তার সাথে এতকাল আছিল যে ভাবের সাথীও।*……. ‘পরাণের গহীন ভিতর’ তুমি যেন এভাবেই নতুন করে বাজতে থাকো।
আমায় নিয়ে ভেবো না, শুধু তোমার প্রার্থনায় রেখো; আমি ঠিক আছি। আর তুমি ভালো থেকো, সব সময় খুব খুব ভালো থেকো।
নিলিশ্বরী,
২৮’শে জুলাই ২০১৭,
ধানমন্ডি, ঢাকা




লেখনীর সূত্রপাত শুরু এখান থেকে .jpg)







এটা কেবল চিঠি বা স্মৃতিচারণা নয় । এ এক দীর্ঘশ্বাসে লেখা আত্মার দলিল। ভালোবাসা, অপরাধবোধ, অনুশোচনা, বিশ্বাস আর আত্মঅনুসন্ধান এখানে ভাষা পেয়েছে খুব নিঃসংকোচে, খুব মানবিকভাবে। কবিতা–দর্শন–ইতিহাস–ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মেলবন্ধনে লেখাটি সময়কে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে থাকে; যেখানে প্রেম হারানোর নয়, বহন করার নাম। সবচেয়ে সুন্দর দিকটা হলো এখানে কেউ বিজয়ী বা পরাজিত নয়, দু’জনই মানুষ, দু’জনই অসম্পূর্ণ, তবু গভীরভাবে জীবিত। খুব ভাল লাগলো ।
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি এই লেখাটি পড়তে পড়তে একসময় মনে হয়, প্রেম এখানে মুখ্য বিষয় নয়; বরং প্রেমকে উপলক্ষ করে লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, পাঠব্যাপ্তি ও সাংস্কৃতিক পুঁজি প্রদর্শনই প্রধান হয়ে উঠেছে। আবেগের স্বাভাবিক প্রবাহ বারবার থেমে যায় উদ্ধৃতি, দর্শন, ইতিহাস ও নামের ভারে। ফলে যে ভালোবাসা ব্যক্তিগত, নীরব ও সংবেদনশীল হওয়ার কথা ছিল, তা ক্রমে এক ধরনের আত্মপ্রদর্শনী গদ্যে রূপ নেয়। চে গুয়েভারা, সক্রেটিস, রবীন্দ্রনাথ, সৈয়দ শামসুল হক—এত ঘন ঘন রেফারেন্স ব্যবহারে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে: লেখক কি সত্যিই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলছেন, নাকি পাঠকের সামনে নিজের জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে দিচ্ছেন? প্রেমের ভাষা যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত ও অনাড়ম্বর হওয়ার কথা, সেখানে এই অতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ অনুভূতিকে কৃত্রিম করে তোলে।আরও সমস্যা হলো, লেখকের আত্মস্বীকারোক্তি অনেক সময় অনুশোচনার বদলে আত্মকেন্দ্রিক বেদনাবিলাসে পর্যবসিত হয়। প্রিয় মানুষকে ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়ার বর্ণনাও যেন এক ধরনের নৈতিক উচ্চাসনে বসে নিজেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ হয়ে ওঠে যেখানে ভুক্তভোগীর যন্ত্রণা গৌণ হয়ে যায়, আর লেখকের মানসিক জটিলতাই প্রধান আলোচ্য বিষয়।সব মিলিয়ে, এই লেখা প্রেমের গভীরতা দিয়ে নয়, বরং লেখকের মন্সিয়ানা দেখানোর আকাঙ্ক্ষা দিয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে। পাঠক শেষ পর্যন্ত প্রেমে নয়, লেখকের নিজের প্রতি মুগ্ধতার সঙ্গেই বেশি সময় কাটান যা একটি প্রেমভিত্তিক গদ্যের জন্য মৌলিক এক ব্যর্থতা বলেই মনে হয়।
Deleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি এই লেখাটিকে যদি কেবল প্রেমের সরল স্বীকারোক্তি হিসেবে পড়া হয়, তবে একে আত্মপ্রদর্শনী মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এই গদ্য প্রেমকে একমাত্র বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি চেতনাগত অভিজ্ঞতা হিসেবে ধারণ করতে চেয়েছে—যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি একা দাঁড়িয়ে থাকে না, বরং পাঠ, স্মৃতি, ইতিহাস ও দর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এখানে উদ্ধৃতি বা রেফারেন্স কোনো অলংকারমাত্র নয়; এগুলো লেখকের মানসিক গঠনের স্বাভাবিক অংশ। যিনি যেভাবে ভাবেন, যেভাবে বাঁচেন, প্রেমও তাঁর কাছে সেভাবেই ধরা দেয়। এই লেখা সেই প্রেমের কথা বলে না যা কেবল দু’জন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বরং এটি সেই প্রেম, যা মানুষকে নিজের বিশ্বাস, অপরাধবোধ, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফলে চে গুয়েভারা বা সক্রেটিস এখানে ‘জ্ঞান প্রদর্শন’-এর জন্য নয়, বরং লেখকের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও আত্মঅনুসন্ধানের ভাষা হিসেবে উপস্থিত। যে মানুষ নিজের জীবনের সংকটকে দর্শন ও সাহিত্যের আলোয় বোঝার চেষ্টা করে, তার প্রেমের ভাষাও স্বাভাবিকভাবেই সেই আলোতেই নির্মিত হয়। আত্মস্বীকারোক্তির ক্ষেত্রেও লেখাটি আত্মমুগ্ধতার চেয়ে বেশি করে আত্মদহন। প্রিয় মানুষকে কষ্ট দেওয়ার স্বীকারোক্তি এখানে নৈতিক উচ্চাসন নয়, বরং নিজের অক্ষমতা ও ভাঙনের নির্মম স্বীকার। ভুক্তভোগীর যন্ত্রণা গৌণ হয়ে গেছে—এই অভিযোগের ভেতরেও একটি সত্য আছে, কিন্তু সেটিই লেখাটির ট্র্যাজেডি: এই প্রেম একপাক্ষিকভাবে বহন করা যন্ত্রণার কথা বলে, যেখানে অপরের নীরবতা লেখকের আত্মকথনকে আরও ভারী করে তোলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই লেখা প্রেমকে ‘সুন্দর করে তোলার’ চেষ্টা করে না। এটি প্রেমকে জটিল, অস্বস্তিকর, কখনো আত্মকেন্দ্রিক এবং কখনো নিষ্ঠুর হিসেবেই তুলে ধরে। এই অস্বস্তিই তার সাহিত্যিক মূল্য। কারণ ভালো সাহিত্য সবসময় আরাম দেয় না; কখনো কখনো তা পাঠককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—এই লেখা ঠিক সেটাই করে।অতএব, যদি এই গদ্য প্রেমের কোমলতা নয়, বরং লেখকের চেতনাগত বিস্তার দিয়েই বেশি মনে থাকে—তাও এক ধরনের সাফল্য। কারণ এখানে প্রেম নিজেই একটি মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে একজন মানুষের বুদ্ধি,বিশ্বাস,অপরাধবোধ ও স্মৃতির জটিল মানচিত্র উন্মোচিত হয়। এই উন্মোচন হয়তো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু নিঃসন্দেহে তা সাহিত্যিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
Deleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি আত্মকথনের সাহস ও নৈতিক নগ্নতা
ReplyDeleteএই লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক তার নির্লজ্জ সততা। এখানে লেখক নিজেকে রক্ষা করেন না, নায়ক বানান না। প্রেমে আহত, অপরাধী, বিশ্বাসভ্রষ্ট, অনিশ্চিত—সব পরিচয় একসাথে বহন করে তিনি নিজেকে উন্মুক্ত করেছেন। এই নৈতিক নগ্নতা বাংলা সাহিত্যে বিরল এবং সাহসী।পত্রসাহিত্যের আধুনিক পুনর্গঠন প্রশংসনীয়। এটি চিঠি হলেও প্রচলিত পত্ররীতির বাইরে গিয়ে এক ধরনের সময়-অতিক্রমী সংলাপ হয়ে উঠেছে। প্রেরক–প্রাপক এখানে কেবল ব্যক্তি নয়, বরং স্মৃতি, সময় ও অনুপস্থিতির সঙ্গে কথোপকথন। ফলে লেখাটি পত্রসাহিত্যের আধুনিক রূপ হিসেবে পাঠযোগ্য। অনেক শুভ কামনা ।
মুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি ভাল লেগেছে পড়তে। লেখাটির প্রধান শক্তি তার আবেগ, কিন্তু সেই আবেগই কোথাও কোথাও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। প্রায় প্রতিটি অনুচ্ছেদেই উচ্চমাত্রার যন্ত্রণা, অনুশোচনা ও আত্মদহন উপস্থিত থাকায় পাঠকের জন্য শ্বাস নেওয়ার জায়গা কমে যায়। সাহিত্যিক গদ্যে আবেগের পাশাপাশি সংযম জরুরি না হলে অনুভূতির তীব্রতা একসময় একরকম একঘেয়েমিতে পরিণত হতে পারে। উদ্ধৃতিনির্ভরতা ও স্বর-স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে উত্তরন ঘোটাতে পারেনি। সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হাসান, রবীন্দ্রনাথ, সক্রেটিস, চে গুয়েভারা এত ঘন ঘন উদ্ধৃতি কখনো কখনো লেখকের নিজস্ব কণ্ঠকে আড়াল করে দেয়। প্রশ্ন জাগে, এই লেখা কি নিজের যন্ত্রণার ভাষা খুঁজে পেয়েছে, নাকি পরিচিত মহান কণ্ঠগুলোর আশ্রয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে? উদ্ধৃতি শক্তি বাড়াতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত হলে তা লেখকের স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে।
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি ভাল লেগেছে । প্রেমের রোমান্টিকীকরণ নয়, অস্তিত্ববাদী পাঠ এখানে প্রেম কোনো মুক্তির প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এক ধরনের অস্তিত্বগত ভার। ভালোবাসা এখানে আনন্দের চেয়ে দায়, দায়িত্ব এবং দীর্ঘ বহনযোগ্য যন্ত্রণা। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রেমকে গভীরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক ও দার্শনিক করে তোলে। অনন্য লেখনী । এই চিঠির মাধ্যমে অনেক কিছু জানা যায় । মেধা ও মননকে সমৃদ্ধ করে । ভাল থাকবেন আরও ভাল লিখুন এই কামনা করি ।আলকরেখাকে ধন্যবাদ ।
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি ভাল লেগেছে । কিন্তু অতিরিক্ত তথ্যের কারনে প্রেমের আবেগ বাধাগ্রস্থ হয়েছে ।এখানে ‘মিসফিট’ আত্মপরিচয়ের সাহিত্যিক নির্মাণ । Arthur Miller–এর ‘misfit’ ধারণা এখানে কেবল আত্মবর্ণনা নয়, বরং আত্মপক্ষ সমর্থন। সমাজ, সংসার, ক্ষমতা ও পুনরাবৃত্ত জীবনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লেখক নিজেকে এক সচেতন বহিরাগত হিসেবে নির্মাণ করেছেন যা আধুনিক মানুষের পরিচিত সংকট। অপরাধবোধ ও আত্মশাস্তির ভাষা লেখাটিতে অনুশোচনা আত্মকরুণায় পর্যবসিত হয়নি; বরং তা এক ধরনের আত্মশাস্তির রূপ নিয়েছে। প্রিয় মানুষকে ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়ার স্বীকারোক্তি সাহিত্যে খুব কমই এমন নির্মম স্বচ্ছতায় আসে।ভাল মন্দ সবকিছু মিলে সুখ পাঠ্য ।অনেক শুভ কামনা রইল।
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি ভাল পড়ে খুব ভাল লেগেছে । নিলিশ্বরীর কণ্ঠ করুণ হলেও দুর্বল নয়। মাতৃত্ব, একাকীত্ব, আবেগ, স্মৃতি। সবকিছু মিলিয়ে তিনি কোনো ‘পরাজিত নারী’ নন, বরং গভীরভাবে আত্মসচেতন এক মানবী চরিত্র বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব আগ্নেয়বাদী নাস্তিকতা থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে পড়া এই রূপান্তর কোনো ধর্মীয় প্রচার নয়, বরং এক ক্লান্ত আত্মার আশ্রয় খোঁজা। “A saint has a past and a sinner has a future”এই লাইনটি লেখার নৈতিক কেন্দ্র। আত্মস্বীকারোক্তির নৈতিক জটিলতা লেখক নির্মমভাবে স্বীকার করেছেন প্রিয় মানুষকে ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়ার কথা। এই স্বীকারোক্তি সাহসী হলেও সাহিত্যিকভাবে একটি নৈতিক প্রশ্ন তোলে এই স্বীকারোক্তি কি সত্যিকার অনুশোচনা, নাকি আত্মদুঃখকেই কেন্দ্র করে আরেক ধরনের আত্মমুগ্ধতা? পাঠক এখানে দ্বিধায় পড়েন, সহানুভূতি দেবেন নাকি প্রশ্ন তুলবেন। কাঠামোগত শৈথিল্য ও পুনরুক্তির সমস্যা লেখাটি দীর্ঘ এবং সময়ের স্তর ভেঙে ভেঙে এগিয়েছে, যা স্মৃতির প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই হলেও, কোথাও কোথাও একই অনুভূতি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় বারবার ফিরে এসেছে। শক্তিশালী সম্পাদনা হলে লেখাটি আরও তীক্ষ্ণ, সংহত ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত। আশা করি লেখক এই বিষয়ে খেয়াল রাখবেন ।ভাল থাকুন!
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি অনবদ্য হৃদয়ের প্রকাশ ।২০১৭ সালের তারিখ, ১৯ বছর আগের চিঠি, যুগ যুগান্তরের স্মৃতি—সব মিলিয়ে সময় এখানে সরলরৈখিক নয়। এই ভাঙাচোরা সময়বোধ লেখাটিকে স্মৃতির বাস্তব অভিজ্ঞতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। ভাষার দ্বৈততা: বাংলা ও ইংরেজির সহাবস্থান বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অনায়াস মিশ্রণ কৃত্রিম নয়; বরং চরিত্রের মানসিক দ্বৈততারই প্রতিফলন। এই কোড-সুইচিং সমকালীন শহুরে বুদ্ধিজীবী মানসিকতার সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব করে। খুব ভাল লিখেছেন ।অনেক কিছু জানা যায় ।অনেক তথ্যবহুল। এবং গবেষণামূলক চিঠির আধার। আন্তরিক শুভেচ্ছা !
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি অনবদ্য । প্রেমের ভাষায় উঠে এসেছে বাস্তব জীবনের তথ্য । মৃত্যুচিন্তা ও ‘real me’ ধারণা এখানে সক্রেটিস প্রসঙ্গটি লেখাটিকে হঠাৎ এক গভীর দার্শনিক স্তরে নিয়ে যায়। শরীর বনাম সত্তা, মৃত্যু বনাম চেতনাবোধ ।এই দ্বন্দ্ব প্রেমের বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক অনন্য অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন তোলে। পাঠকের উপর স্থায়ী আবেশ এই লেখা পাঠ শেষে শেষ হয় না। এটি পাঠকের ভেতরে থেকে যায় ।একটি অস্বস্তি, একটি প্রশ্ন, একটি দীর্ঘ নীরবতা হয়ে। ভালো সাহিত্য যেমন পাঠককে বদলে দেয়, এই লেখাটিও তেমনই এক নীরব রূপান্তরের কাজ করে।
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি অনন্য হৃদয়বোধের প্রকাশ । আত্মবিনাশ ও আত্মরক্ষার দ্বৈত টানাপোড়েন এই লেখায় লেখক একসঙ্গে আত্মবিনাশী ও আত্মরক্ষাকারী। প্রিয় মানুষকে ইচ্ছাকৃত আঘাত করার স্বীকারোক্তি যেমন আছে, তেমনি আছে তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার অবচেতন প্রচেষ্টা। এই দ্বন্দ্ব প্রেমকে নৈতিক প্রশ্নে পরিণত করে। ভালোবাসা কি কাছে টানার নাম, নাকি কখনো কখনো দূরে সরিয়ে দেওয়ার দায়? অতন্ত্য সুন্দরভাবে উঠে এসেছে এই কথা গুলো। কে স্মৃতি ধারণ করবে, কে ভুলে যাবে এই প্রশ্ন লেখাটির গভীরে কাজ করছে। নিলিশ্বরী স্মৃতি ধরে রাখার মানুষ, শুভাশীষ ভুলে বাঁচতে চাওয়ার মানুষ। এই দ্বন্দ্বে এক ধরনের ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হয়, যেখানে স্মৃতিধারীই শেষ পর্যন্ত বেশি আহত হয়। অপূর্ব লেখনী ।
ReplyDeleteমুনা চৌধুরীর শুভাশীষকে চিঠি অনন্য। এখানে যেমন পুরুষত্বের ভাঙন ও স্বীকারোক্তিমূলক ভাষা উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যে পুরুষ চরিত্রের এমন ভাঙা, অপরাধী, দ্বিধাগ্রস্ত স্বীকারোক্তি এখনও বিরল। এখানে পুরুষত্ব শক্তি বা নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং বিভ্রান্তি, ভয়, আত্মঘৃণা ও পালিয়ে যাওয়ার নাম। এই ভাঙন লেখাটিকে সমকালীন করে তোলে। তেমনি নিলিশ্বরী কেবল প্রেমিকা নন; তিনি মা, তবু তার পরিচয় সেখানে থেমে যায় না। মাতৃত্ব এখানে আত্মবিসর্জন নয়, বরং বেঁচে থাকার নৈতিক কারণ। সন্তানদের উপস্থিতি লেখাটিকে নিছক প্রেমবেদনার লেখা হতে দেয় না।লেখাটিতে প্রেম ও ঈশ্বর মুখোমুখি দাঁড়ায়, কিন্তু পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং দুটোই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা। প্রেম ব্যর্থ হলে বিশ্বাসের দিকে যাত্রা—এখানে তা কোনো ধর্মান্তর নয়, বরং ক্লান্ত মানুষের শেষ আশ্রয়। খুব ভাল লেগেছে । সুখ পাঠ্য! ভাল থাকবেন ।আলকরেখাকে অনেক ধন্যবাদ এমন একটা লেখা প্রকাশের জন্য যা আমাদের সমৃদ্ধ করে ।
ReplyDeleteশুভাশীষকে চিঠিতে মুনা চৌধুরীর অনন্য প্রেমের প্রকাশ পেয়েছে । লেখাটি আবেগে পরিপূর্ণ। কখনো কখনো প্রায় অতল। একজন সাহিত্যিক পাঠক লক্ষ করবেন, এই অতিরিক্ত আবেগই লেখার শক্তি এবং ঝুঁকি দুটোই। তবু এই ঝুঁকি গ্রহণ না করলে এমন সৎ লেখা সম্ভব হতো না। সময়ের ব্যবধান ও অনুভূতির অপরিবর্তনীয়তা দূরত্ব, বছর, মহাদেশ বদলালেও অনুভূতির কেন্দ্রে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। এই স্থিরতা লেখাটিকে রোমান্টিক করে না; বরং ট্র্যাজিক করে তোলে কারণ সময় এখানে আরোগ্য নয়, কেবল সাক্ষী। লেখাটির নৈতিক সমাপ্তিহীনতা প্রশংসনীয় ।এই লেখা কোনো মীমাংসা দেয় না, কোনো ‘closure’ তৈরি করে না। বরং পাঠককে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেয়। এই অসমাপ্তি সাহিত্যের শক্তি কারণ বাস্তব জীবনও খুব কমই সমাধানে পৌঁছায়।
ReplyDeleteশুভাশীষকে চিঠিতে মুনা চৌধুরীর অনন্য সুন্দর। এই লেখাটি নিছক স্মৃতিচারণা বা প্রেমপত্র নয়; এটি এক ধরনের আত্মসম্মুখীনতা, যেখানে লেখক নিজের সবচেয়ে ভঙ্গুর ও অস্বস্তিকর জায়গাগুলোর দিকে নির্দ্বিধায় তাকিয়েছেন। এই সাহসই লেখাটির প্রধান শক্তি। তবে সেই শক্তির মধ্যেই তার সীমাবদ্ধতাও লুকিয়ে আছে। আবেগ এখানে এতটাই প্রবল যে, অনেক সময় তা ভাষাকে ছাড়িয়ে যেতে চায়—ফলে পাঠক কখনো অনুভব করেন, অনুভূতির ঘনত্বের নিচে ভাবনার স্বচ্ছতা খানিক চাপা পড়ে যাচ্ছে। যন্ত্রণা, অনুশোচনা ও আত্মস্বীকারোক্তির স্তরগুলো আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে ওঠে । লেখাটির আন্তঃপাঠিকতা নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নসাপেক্ষ। সৈয়দ শামসুল হক থেকে সক্রেটিস—এই বহুস্বর একদিকে লেখাটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা দেয়, অন্যদিকে কোথাও কোথাও লেখকের নিজস্ব স্বরের উপর ছায়া ফেলে। মনে হয়, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা যেন বারবার পরিচিত মহৎ কণ্ঠের আশ্রয়ে বৈধতা খুঁজছে। একজন পাঠক হিসেবে প্রত্যাশা জাগে । এই যন্ত্রণা আরও নিরাভরণ, আরও একাকী ভাষায় প্রকাশ পেলে কি তার অভিঘাত আরও তীব্র হতো না? সবচেয়ে জটিল জায়গাটি হলো নৈতিকতা। প্রিয় মানুষকে ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়ার স্বীকারোক্তি লেখাটিকে সাহসী করে তুললেও, তা পাঠকের সহানুভূতিকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। অনুশোচনা এখানে গভীর, কিন্তু তার সঙ্গে আত্মকেন্দ্রিক বেদনাবোধ এমনভাবে মিশে আছে যে পাঠক নিশ্চিত হতে পারেন না—এটি কি সত্যিকারের দায় স্বীকার, নাকি আত্মদুঃখের আরেকটি নান্দনিক রূপ।
ReplyDeleteThis comment has been removed by a blog administrator.
ReplyDelete
ReplyDeleteএপিসোড ৮ এর সকল পাঠকদের আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ। উপন্যাসটা যখন লেখা শুরু করেছিলাম, তার প্রথম কারণ ছিল আমার প্রিয় কবিতা গুলি আর গল্পগুলি যেন একসাথে কোথাও লিখে রেখে যাই। এভাবেই গল্পের শুরু। আমার প্রিয় একজন পাঠক এই এপিসোড নিয়ে মন্তব্য করেছেন "প্রেম এখানে মুখ্য বিষয় নয়; বরং প্রেমকে উপলক্ষ করে লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, পাঠব্যাপ্তি ও সাংস্কৃতিক পুঁজি প্রদর্শনই প্রধান হয়ে উঠেছে।লেখক কি সত্যিই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলছেন, নাকি পাঠকের সামনে নিজের জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে দিচ্ছেন?" আমি খুব দুঃখিত কারণ আমার তেমন কোনো পাঠব্যাপ্তি, সাংস্কৃতিক পুঁজি নেই যা আমি দেখাবো - আমি লেখক হিসেবে নগন্য যার তেমন বই পড়া হয়নি বা সাহিত্য নিয়ে তেমন জ্ঞান ও নেই। শুভাশীষ কে চিঠি আমার প্রথম উপন্যাস লেখার চেষ্টা মাত্র।
লেখক হিসেবে আপনাদের সবার প্রশংসা এবং সমালোচনার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। অনেকগুলো বিষয় আমি খেয়াল রাখবো যা অনেক পাঠকরা বলেছেন - যেমন অতিরিক্ত আবেগ যেন পাঠকের শ্বাস রোধ না করে, অতিরিক্ত তথ্য যেন কথোপকথনে চরিত্রদের নিজস্ব স্বরের উপর ছায়া না পড়ে।
শুভাশীষ এর চরিত্র নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য আমার খুব ভালো লেগেছে কারণ মানুষটা পাঠকের কাছে একটা বিরাট প্রশ্নবোধক !! শুভাশীষ চরিত্রটা নিস্পৃহ, আত্মপ্রেমিক, আত্মকেন্দ্রিক, জটিল, ভারসাম্যহীন এবং নিলিশ্বরী এর উল্টোটা যেমন সহজ, সাধারণ, সহানুভূতিশীল। মৌসুমী ধরে ফেলেছেন শুভাশীষ একটা বিভ্রান্তি, রুমানা ও বুঝে ফেলেছেন আমি বলতে চেয়েছি দূরে ঠেলে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার আরেক নাম ভালোবাসা। ইশতিয়াক এর জন্য লেখাটা নীরব রূপান্তরের কাজ করেছে। অসীম গোস্বামী'র কাছে ভাষার মিশ্রণ ও সহবস্থান কৃত্রিম লাগেনি। মেধার কাছে "সৎ লেখা"র আবেগ ভালো লেগেছে। রত্নাবলী'র কাছে গল্পটার প্রেম এক অস্তিত্ববাদী পাঠ। এছাড়াও গঠনমূলক সমালোচনার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, বাধিত সকল পাঠকদের কাছে - মমতা শঙ্কর, মোহন সিরাজী, মিতালি মুখোপাধ্যায়, পাবলো, ডঃ অজিত রায়, মোহন রায়হান এবং সানজিদা রুমি। শুভকামনায় লেখক