আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও -আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও-যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে..আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে..এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও..আমার পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান-তার নাইকো বাণী নাইকো ছন্দ নাইকো তান..তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁইয়ে দাও পরীর দেশে রাজকুমার --------- বদরুদ্দোজা চৌধুরী ~ alokrekha আলোক রেখা
1) অতি দ্রুত বুঝতে চেষ্টা করো না, কারণ তাতে অনেক ভুল থেকে যায় -এডওয়ার্ড হল । 2) অবসর জীবন এবং অলসতাময় জীবন দুটো পৃথক জিনিস – বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন । 3) অভাব অভিযোগ এমন একটি সমস্যা যা অন্যের কাছে না বলাই ভালো – পিথাগোরাস । 4) আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও , আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব- নেপোলিয়ন বোনাপার্ট । 5) আমরা জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহন করি না বলে আমাদের শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না – শিলার । 6) উপার্জনের চেয়ে বিতরণের মাঝেই বেশী সুখ নিহিত – ষ্টিনা। 7) একজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি আরেকজন ঘুমন্ত ব্যাক্তি কে জাগ্রত করতে পারে না- শেখ সাদী । 8) একজন দরিদ্র লোক যত বেশী নিশ্চিত , একজন রাজা তত বেশী উদ্বিগ্ন – জন মেরিটন। 9) একজন মহান ব্যাক্তির মতত্ব বোঝা যায় ছোট ব্যাক্তিদের সাথে তার ব্যবহার দেখে – কার্লাইন । 10) একজন মহিলা সুন্দর হওয়ার চেয়ে চরিত্রবান হওয়া বেশী প্রয়োজন – লং ফেলো। 11) কাজকে ভালবাসলে কাজের মধ্যে আনন্দ পাওয়া যায় – আলফ্রেড মার্শা
  • Pages

    লেখনীর সূত্রপাত শুরু এখান থেকে

    পরীর দেশে রাজকুমার --------- বদরুদ্দোজা চৌধুরী

    "যদি হাসতে ভালোবাসো না হয় একটু খানি হাসো
      


     পরীর দেশে রাজকুমার
     বদরুদ্দোজা চৌধুরী 


     রাজপুত্রের নাম চপল কুমার। বছর পাঁচেক বয়স। ফুটফুটে সুন্দর। চাঁদের মত গোলমুখ। কাঁচা সোনার মত গায়ের রং। সাদা দু’চোখে নীল দু’টো চোখের তারা। সুন্দর নাক। লাল গোলাপের মতো টুকটুকে দু’টো ঠোঁট। হাসি-খুশি, মিষ্টি রাজপুত্র চপল কুমার। রানীমা বলেন -
    "খুশির হাসি হাসিস্ যখন মুক্তো ঝরে যায়,
    চোখের জলে মানিক জলে কান্না যখন পায়"
    ঐ বয়সেই কালো মেঘের মত ঘাড় পর্যন্ত বাবরি চুল শেষের দিকটায় একটু আবার কোঁকড়ানো।
    পাঁচ বছরের চপল কুমার ভীষণ ছট্ফটে। মা তাকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে আদর করে বলেন,

    ডালিম সোনা, চাঁদের কণা।

    ফট্ করে চপল কুমারের প্রশ্ন -
    মা, আমি চাঁদের দেশে যাবো।
    রানীমা বলেন -
    না বাবা চাঁদে নয়,
    চাঁদে আছে এক বুড়ি।
    তোমার ওখানে গিয়ে কাজ নেই,
    বুড়ি থুত্থুড়ি।
    চপল কুমার বলে -
    থাক মা, আমি বুড়ির বাড়ি যাব না।
    বুড়ির চরকা চাই না।
    আমি যাব পরীর দেশে,
    যেখানে পরীরা নাচে হেসে হেসে।
    মা হেসে গাল টিপে দেয়। ঠিক আছে - যেও যেও পরীর দেশ যেও। আমি পরীর দেশের রানীকে বলে দেবো।
    চপল কুমার বলে - বলবে তো মা ঠিক - বলবে তো?
    না বললে ভাত খাব নাকো।
    রানীমা আবার হাসে সত্যি, সত্যি, সত্যি, তিন সত্যি। তবে পরীমার সাথে দেখা হলে তো বলবো।
    চপল কুমার রোজ শুতে যাবার আগে একবার করে মাকে বলে -
    তুমি পরীর দেশের রানীকে বলছো, মাগো?
    রানীমা হেসে কয় -
    ওর সাথে দেখাই হয়নি যে।



     চপল কুমার গাল ফুলিয়ে শুতে যায় আর রোজ ভাবে -
    কবে যে পরীর দেশের রানী এসে,
    নিয়ে যাবে সেই দেশে।
    রাত যায়, দিন যায়, চাঁদ ক্ষয়ে ক্ষয়ে সরু হয়,
    সরু চাঁদ ধীরে ধীরে বড় হয়,
    আকাশে তারার মেলা
    সে এক দারুণ খেলা।
    কিন্তু কই পরী তো আসে না। একদিন চপল কুমার শুয়ে শুয়ে খুব ভাবছিল। সত্যই কি পরীর দেশের রানী আসবে না। তার পরীর দেশে যাবার ইচ্ছে কী পুরোবে না? চপল কুমার ভাবছে আর ভাবছে। তার খুব কান্না পায়। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে গেছে তার নিজেরও খেয়াল নেই।
    গভীর রাতে চপল কুমারের ঘুম ভেঙ্গে যায় একটা ফিস ফিস আওয়াজে। কে যেন ডাকলো চপল কুমার, চপল কুমার, আমি পরীর দেশের রাজকন্যা তোমাকে নিতে এসেছি।
    দু'হাতে চোখ কচলে চপল কুমার উঠে বসে। আরে! এ যে সত্যি সত্যিই ফুটফুটে পরীর দেশের রাজকন্যা। চপল কুমারের চেয়ে মাথায় বেশ একটু বড়ো। নীল শাড়িতে কত তারার চুমকি বসানো। গলায় হাতে কি সুন্দর ফুলের গয়না। ধবধবে সাদা দু’টো পাখা পিঠের উপরে, তাতে হীরের টুকরোগুলো ছড়ানো। পাখাগুলো ঝলমল করছে। মাথায় ঝলমলে ছোট্ট একটা মুকুট তার ঠিক মাঝখানে শুকতারার মতো ছোট একটা তারা। এক হাতে তার সোনায় মোড়া হালকা একটা ছোট জাদুর লাঠি। পরীর দেশের মেয়েটির মুখটা মিষ্টি, আর হাসিটা ? মনে হয় এই মাত্র এক রাশ গোলপ ফুল ফুটে উঠল।

    চপল কুমার অবাক হয়ে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলো পরীর দিকে। পরীটা হাসছে, বললো -
    চপল কুমার, আমি এসেছি। সত্যিই তোমার স্বপ্নের পরী আমি। তোমাকে নিতে এসেছি।
    - কোথায়? কোথায় যাব আমরা? প্রশ্ন করে চপল কুমার।
    - আমার সাথে যাবে, পরীর দেশ দেখবে। বললো পরী।
    - তোমার দেশটা কেমন? জিজ্ঞেস করল চপল কুমার।
    - আমাদের দেশেও অনেক গাছ, ফুল, লতা আর পাখি আছে। অনেক নদী আছে, ঝর্ণা আছে। পাহাড় আছে, সুন্দর সুন্দর বন আছে। সাগরও আছে, আর আছে হাজার হাজার ফুল বাগান।

    - তোমাদের দেশটা তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের দেশের চাইতে সুন্দর। বললো চপল কুমার।
    - না,  ঠিক তা বলবো না। তোমাদের পৃথিবীতেও কতো সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। কতো ঝর্ণার দেশ, পাহাড়ের দেশ, ফুলের দেশ আছে। কিন্তু তা হলেও আমাদের দেশের গাছ-পালা, ফুল-লতা যাই বলোনা কেন, সবকিছুর একটা বিশেষ গুণ আছে। যদিও দেখতে তোমার চেনা-চেনা লাগবে কিন্তু ওরা সবাই কথা বলতে পারে। বললো পরী কন্যা।
    - কি বল? কথা বলতে পারে? সত্যি? তাহলে নিশ্চয়ই ওরা গান গাইতে পারে।
    - হ্যাঁ, ঠিক বলেছো চপল কুমার। কিন্তু ওর একটা জিনিস পারে না। ওরা ঝগড়া করতে পারে না। পৃথিবীতে যেমন গান আছে, কবিতা আছে, কিন্তু একই সঙ্গে ঝগড়াও আছে, খুনো-খুনিও আছে। আমাদের দেশে ঝগড়া খুনো-খুনি নেই। ওরা ওসব জানেই না। আর ঝগড়া-ঝাটি, খুনো-খুনি না শিখতে পারে সেজন্য আমরা পৃথিবীর কাউকে বেড়াতে নিয়ে গেলেও থাকতে দেই না। বললো পরী।
    চপল কুমার বললো - আমার মাকে ছেড়ে আমিও কোথাও থাকতেও চাই না। তোমাদের দেশেও না। আমি শুধু যাবো, দেখবো, ফিরে আসবো।
    পরী মেয়েটি হাসলো।
    - একটা জিনিস তুমি বলোনি, ঐ দেশেতে যাবে, আসবে কিন্তু শুধু দেখতে নয় কিছু শিখতেও হয়।
    চপল কুমার বললো - কি শিখতে হয় বলোই না -
    পরী বললো- আমার সাথে চলোই না।
    এরপর পরী চপল কুমারের বিছানায় বসলো, পরী চপল কুমারকে পিঠে এমন করে আটকে নিলো যাতে চপল কুমার কিছুতেই পড়ে না যায়। তারপর খোলা দরজা দিয়ে, বারান্দা দিয়ে পরী তাকে কাঁধে নিয়ে সুন্দর করে পাখির মতো উড়িয়ে নিয়ে গেলো। পরী জিজ্ঞেস করল - ভয় করছে?

     চপল কুমার বললো - একটুও না।
    পরী বললো - তোমাকে শক্ত করে আটকে রেখেছি। তুমি শুধু শক্ত করে ধরো এবং চারদিক দেখো।
    নীচে তাকিয়ে চপল কুমার কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। আকাশে ছিল সরু বাঁকা চাঁদ। তারাগুলি মিট মিট করে জ্বলছিলো। দেখতে দেখতে বোধ করি চপল কুমার একটু ঘুমিয়েও পড়েছিলো।
    হঠাৎ পরী তাকে ডাকছে - চপল কুমার, চপল কুমার ওঠো, দেখো আমরা পরীর দেশে এসে গেছি।
    চপল কুমার চোখ বড় বড় করে তাকায়। সত্যিই তো ঝলমলে ভোরের আলোয় পরীর দেশকে কি সুন্দরই না দেখাচ্ছে।
    ফুলগাছ আর ফুলগাছ, চারিদিকে ফুলগাছ। বাগান আর বাগান। অজস্র  লাল, নীল, সবুজ রঙের পাখি ঝাকে ঝাকে উড়ে বেড়াচ্ছে। কুল কুল করে নদী বয়ে যাচ্ছে। ঝপ্ ঝপ্ করে একটু বৃষ্টি হয়ে গেলো তাও যেন বাজনা বাজাতে বাজাতে।
    পরী বললো - এবার আমরা মাটিতে নামছি। চপল কুমার, তোমাকে আমি সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো।
    বিশাল এক মাঠের মাঝখানে পরীটি এসে নামলো। লাল, নীল, বেগুনী, হলুদ, সবুজ, সাদা কত রকমের ফুল হালকা বাতাসে দুলছে।
    পরী বললো - শোনো হে ফুলেরা, পৃথিবীর রাজপুত্র চপল কুমার এসেছে তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে।
    কি আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে চারদিকের ফুলগুলো একটু জোরে দুলে উঠলো। সবাই জোরে জোরে খিল খিল করে হেসে উঠলো।


    তারপর একই সঙ্গে কথা বলে উঠলো - চপল কুমার, চপল কুমার, শুভেচ্ছা নাও আমাদের।
    চপল কুমার হাত নেড়ে বললো - পরীর দেশের ফুলেরা, ভালোবাসা নাও আমার।
    চপল কুমার আরো বললো - তোমরা  এতো সুন্দর! 
    সবচেয়ে বড়ো ফুলটা চপল কুমারের দিকে তাকিয়ে বললো - আমাদের কাজই তো সুন্দর হওয়া। আমরা ছোটদেরও হাসাই। বড়দেরও হাসাই। সুন্দর করে হাসতে শেখাই। 
    চপল কুমার বললো - তোমরা আমাকে একটা ভালো জিনিস শিখিয়েছো। আমি সুন্দর হবো। হাসি-খুশি হবো। সুন্দর করে কথা বলবো ঠিক ফুলের মতো।
    একটু দূরেই সুন্দর সুন্দর অনেকগুলো গাছ। এদের মধ্যে একটা ছোট  গাছ হঠাৎ করে কথা বলে উঠলো - চপল কুমার একটু এদিকে এসো না ভাই।


    চপল কুমার ধীরে ধীরে গাছের কাছে এগিয়ে গেলো। গাছ কথা বলছে -  চপল কুমার, আমার কাছে কিছু শিখতে চাও?
    নিশ্চয়ই শিখতে চাই। বললো চপল কুমার।
    গাছ কথা বলছে - আমরা ফল দেই, খাবার দেই, ছায়া দেই, আসবাব দেই, ঘর-বাড়ি দেই, নৌকা দেই, বেঁচে থাকতে এবং মরে গেলেও আমরা মানুষের শুধুই উপকার করি। উপকার ছাড়া আমরা কিছুই বুঝি না। আমাদের অনেক ধৈর্য।
    চপল কুমার বললো - বুঝেছি, বুঝেছি গাছ ভাই। তোমার কাছে দু’টো জিনিস শিখলাম। আমি তোমার মত উপকারী হবো। তোমার মত ধৈর্যশীল হবো।
    হঠাৎ চপল কুমার দেখে কালো, সাদা, খয়েরী, নীল নানান রঙের কতগুলো পাখি উড়তে উড়তে তার চারপাশে মাটিতে এসে বসলো।
    ওর মধ্যে বড় পাখিটা বললো - চপল কুমার, চপল কুমার, আমাদের কাছ থেকে কিছু জানতে চাও? তাহলে শোনো, আমরা সকাল বেলা গান গেয়ে সবাইকে জাগাই। আমরা কখনো ক্লান্ত হই না। সব সময় আনন্দে ও গানে ভরপুর থাকি। যেখানে ময়লা থাকে, নোংরা থাকে, আমরা সাফ করে দেই। আমরা সবকিছু সুন্দর করে রাখতে চাই।
    চপল কুমার বললো - বুঝেছি তোমাদের মতো আমাকেও প্রাণবন্ত হতে হবে। গানের ভাষার মতো মিষ্টি করে মানুষকে জাগিয়ে দেবো আমি।
    পরী আর চপল কুমার একটু হেঁটে হেঁটে সামনে যেতেই অবাক কাণ্ড! পায়ের নীচ থেকে কথা আসছে।
    - চপল কুমার, আমি মাটি কথা বলছি।



    চপল কুমার মাটিকে বললো - মাটি ভাই, মাটি ভাই, তুমি আমাকে কিছু শেখাবে?
    মাটি বললো - আমার মত বিনয়ী হবে। ধৈর্যশীল হবে। আমার মত উপকারী হবে। যারা কোদাল নিয়ে আমার বুক চিরে যায় আমি হেসে হেসে তাদের শস্য দেই। ফুল-ফল দেই। আমার বুকে কোন রাগ নেই।
    - মাটি ভাই, আমি তোমার মত ধৈর্যশীল হবো, বিনয়ী হবো। ব্যথা দিলেও উপকার করবো। বললো চপল কুমার।
     চপল কুমার এগিয়ে গেলো, কাছে একটি নদী বয়ে যাচ্ছে সেই দিকে। নদীর পাড়ে পৌঁছে পরী আর চপল কুমার ঘাটের উপরে বসলো। আহ্ কি সুন্দর নদী! স্ফটিকের মতো পরিষ্কার পানি। লাল, সাদা, হলুদ কতো রঙের মাছ। ছোট ছোট কচ্ছপ, কত রকমের প্রাণী নদীর ভেতর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। ছোট ছোট ঢেউ উঠছিল নদীতে। ছল-ছল, কল-কল করে কি সুন্দর একটা বাজনা বাজছিলো। ঢেউয়ে ঢেউয়ে যেন হাজার তারের বীণা। ঢেউগুলো সুরের তালে তালে নাচছিল।
    চপল কুমার বললো - নদী তুমি আমাকে কিছু শেখাবে?
    - অবশ্যই শেখাবো। আমি তোমাকে শেখাবো, কতো দেশ-বিদেশ ঘুরে এলাম এই আমি, কতো বিচিত্র জিনিস দেখেছি। এর নাম অভিজ্ঞতা। সব জায়গায় সবার কাছ থেকে আমি পদে পদে শিখেছি।
    চপল কুমার বললো - বুঝেছি আমাকেও সবার কাছ থেকে সব জায়গা থেকে শিখতে হবে, অভিজ্ঞ হতে হবে।
    হঠাৎ ঝপ্ ঝপ্ করে একটু বৃষ্টি নামলো, শুধু এক পশলা। আহা কি মিষ্টি এই বৃষ্টি।
    বৃষ্টি বললো - আমি যেখানে ঝরে পড়ি সেখানেই নতুন জীবনের জন্ম দেই। নতুন ঘাস, লতা, ফসল সবকিছুর উপকারেই আমি ঝরে যাই মাটির বুকে। আমি ঝরে না গিয়ে স্বার্থপরের মতো মেঘের কাঁধে চড়ে শুধুই বেড়াতে পারতাম। আমি তা চাই না। আমি ঝরে যাব কিন্তু সবার উপকার করবো।
    চপল কুমার বললো - আমি তোমার  মতো ঝরে যেতে হলেও মানুষের উপকার করবো। বৃষ্টি, তুমি কি দারুণ মিষ্টি।
    পরী কন্যা বললো - চলো একটু সাগরের কাছে যাই।
    ভোরের সাগর তখন ঢেউয়ে ঢেউয়ে মাতাল। সাদা ফেনার মুকুট পরে গর্জন করে আছড়ে পড়ছে সাগরের তীরে। দূর থেকেই চপল কুমারকে সাগর ডাকলো - এই যে চপল কুমার কাছে এসো। ডাইনে তাকাও, বাঁয়ে তাকাও, সামনে তাকাও - কি দেখলে বলতো ভাই?
    চপল কুমার বললো - তুমি কত বিরাট তাই দেখলাম।
    সাগর বললো - ঠিক ধরেছো। তোমার মনটা হোক এমনই বিরাট।
    চপল কুমার বললো - সমুদ্রের মতো বিরাট মনের অধিকারী হব আমি। সাগর তোমায় ধন্যবাদ।
    ভোরের আকাশ। ভাঙ্গা চাঁদে একটু সোনালী আলো তখনও লেগে আছে। চপল কুমার বললো - চাঁদ মামা তুমি আমার ওপর রাগ করেছো? তোমার বুড়িকে নিয়ে ঠাট্টা করি বলে?
    - তাই যদি হতো তাহলে রাগ করে তোমাকে আলোই দিতাম না। স্নিগ্ধ হাসি হেসে বললো চাঁদ।
    চপল কুমার খুশি হয়ে বললো - আমাকে একটা সুন্দর উপদেশ দাও। তোমার জীবন থেকে।
    চাঁদ বললো - আমি তো আছি আঁধার দূর করে দেয়ার জন্য। শুধু - তাই নয়, ছোট-বড়ো সবার জন্যে আমি একইভাবে আলো দিয়ে থাকি। বড়ো ছোট পার্থক্য করি না।
    চপল কুমার বললো - আমিও পার্থক্য করবো না, ঠিক তোমার মতো। 
     হঠাৎ তাকিয়ে দেখে দূরে সিংহ গুটি গুটি পায়ে আসছে চপল কুমারের দিকে।
    পরী বললো - ভয় পেয়ো না। ও নিশ্চয়ই তোমাকে কিছু বলতে চায়।
    চপল কুমার দেখে সত্যি সত্যিই সিংহ মামা কাছে এসে সুন্দর করে বসলো। ঘাড়ের চুলগুলোকে মাথা ঝাঁকিয়ে সাজিয়ে নিলো।
    সিংহ মামা বললো - চপল কুমার ভাগ্নে, আমার কাছ থেকে একটা কথা নেবে?
    ততক্ষণে চপল কুমারের ভয় চলে গেছে। সে হেসে হেসে বললো - মামা বলো না, দাও না কিছু উপদেশ।
    সিংহ মামা গলার ভেতর থেকে একটু গর্জন করে থামলো। তারপর বললো - আমার একটাই কথা, সাহসী হবে।
    কি ভালোই লাগছিল চপল কুমারের, পরীর দেশের সবার সঙ্গে কথা বলতে। এরা প্রাণ খুলে সুন্দর সুন্দর কথা শোনালো। এরা কেউ কিন্তু শুধু শুধু বড়ো বড়ো কথা বলেনি। তারা তাদের নিজের জীবন থেকে ভালো মানুষের যা শেখা উচিত, তাই শুধু তারা শিখিয়েছে।
    “আপনি আচরি ধর্ম পরের শেখাবে”-- নিজে প্রথমে ভালো কাজ করে অন্যকে ভালো কাজ করতে বলবে। খুব ভালো লাগছে চপল কুমারের। কথাগুলো খুব ভাবতে ইচ্ছে করছিলো। চপল কুমার ভাবছে আর ভাবছে। এরপর তার আর কিছু মনে নেই। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় মায়ের ডাকে।
      - চপল কুমার জাগো, ওঠো সকাল হয়ে গেছে।


    চপল কুমার দু’চোখ কচলে জেগে উঠে বসলো। পাখি কিচির মিচির ডাকছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো, গাছগুলো কি সুন্দর! সকালের নরম আলোয় আজকের সারা পৃথিবী তার কাছে নতুন নতুন লাগছে।
    পরীকন্যা কখন তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে গেছে। মায়ের দিকে আবার সে মুখ তুলে তাকালো। কি আশ্চর্য! মায়ের মুখটা হুবুহু যেন পরীকন্যার মুখ।
    চপল কুমার প্রায় বলতে যাচ্ছিলো - মা তুমি কি পরীর দেশের রানী, নাকি আমার মা?
    প্রশ্ন করতে গিয়েও সে প্রশ্ন করল না।  মা যদি হো হো করে হেসে দেয়? অবশ্য, হাসলে মাকে খুব  দারুন লাগে!!




    13 comments:

    1. মীনাক্ষি করMarch 13, 2020 at 5:07 PM

      কি মিষ্টি ছোটদের গল্প। আলোকরেখায় এই প্রথম ছোটদের জন্য কিছু লেখা। এ শুধু রঙিন মজার গল্পই নয় বাচ্চাদের জন্য শিক্ষামূলক উপদেশ আছে। খুব ভালো লাগলো লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরী'র লেখা পড়ে.অনেক অনেক শুভ কামনা।

      ReplyDelete
    2. মিতা রহমানMarch 13, 2020 at 5:20 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরী'র লেখা পড়ে খুব ভালো লাগলো। আমরা বড় বড় কবিতা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। কিন্তু এবার শিশুদের জন্য গল্প প্রকাশ করে অনেক বড় একটা কাজ করেছে। সেই জন্য আলোকরেখাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      ReplyDelete
    3. মেঘনা গুহMarch 13, 2020 at 5:57 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরী'র লেখা "পরীর দেশে রাজকুমার" পড়ে খুব ভালো লাগলো।এই গল্প থেকে শুধু শিশুদের নয় বড়দেরও অনেক কিছু শেখার আছে। মাটির কাছ থেকে সহনশীলতা ,ফুলেদের কাছ থেকে হাসি খুশি থাকা ,গাছেদের কাছ থেকে উপকার আর ধৈর্য্য শেখা এরকম আরো সুন্দর সুন্দর উপদেশ শেখা যায়। খুব সুন্দর।

      ReplyDelete
    4. শফিক রায়হানMarch 13, 2020 at 6:35 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরী'র লেখা "পরীর দেশে রাজকুমার" মনোরম চোখ ও মন কাঁড়া এক শিশুতোষ গল্প। পড়ে খুব ভালো লাগলো।এই গল্প শুধু চপল কুমারের গল্প নয়। শিক্ষামুলক এক বার্তা। অনেক শুভেচ্ছা লেখক। ভালো থাকুন। আরো লেখা চাই আপনার কাছ থেকে।

      ReplyDelete
    5. মমতা ব্যানার্জিMarch 13, 2020 at 6:44 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরী'র লেখা "পরীর দেশে রাজকুমার" গল্পের প্রথমেই অনেক মূল্যবান কথা লেখা আছে "যদি হাসতে ভালোবাসো
      না হয় একটু খানি হাসো"--লেখক ছোটদের গল্পের মাঝে অনেক বড় বার্তা দিয়েছেন। এই যান্ত্রিক যুগে আমরা হাসতে ভুলে গেছি। তাই লেখক তার লেখনীর মধ্যে দিয়ে এই কথাটাই বলতে চেয়েছেন। খুব ভালো লাগলো। এক কথায় অনবদ্য। অনেক ভালোবাসা লেখককে আর আলোকরেখাকে ধন্যবাদ এই লেখাটা প্রকাশ করার জন্য।

      ReplyDelete
    6. সেজাদ মল্লিকMarch 13, 2020 at 7:38 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর "পরীর দেশের রাজকুমার" ছবি ও গল্প সমৃদ্ধ লেখা। মনে হয়েছে যেন ডিজনির কোন ছবি দেখছি। আলোকরেখায় প্রকাশিত বেস্ট পোস্ট। যেমন নয়নাভিরাম তেমনি বিষয়বস্তু তার উপর উপদেশমূলক। খুবই ভালো লাগলো। অনেক অভিনন্দন লেখককে।

      ReplyDelete
    7. মেনকা চক্রবর্তীMarch 13, 2020 at 7:41 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর "পরীর দেশের রাজকুমার" খুবই ভালো লাগলো।তা অবশ্য আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। শুধু বলতে পারি অনবদ্য অনন্য।

      ReplyDelete
    8. লীনা শংকরMarch 13, 2020 at 8:02 PM

      লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর "পরীর দেশের রাজকুমার" খুবই ভালো লাগলো। আমিও ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। শুধু বলতে পারি আমি যখন আলোকরেখা পড়ি আমার মেয়ে বারবার বিরক্ত করে নিজেও বিরক্ত হয়। কি এত পড়ছো আমাকে বোলো। আমি বলি এগুলো কবিতা বড়দের লেখা তুমি বুঝবে না.আজ আমি তাকে লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর "পরীর দেশের রাজকুমার"এর চপল কুমারের গল্প পরে শোনালাম। সে গল্প শুনে ছবি দেখে মহা খুশি। আজ আলোকরেখার আরেকজন সদস্য বাড়লো। আশা করবো ভবিষ্যতে আরো শিশু সাহিত্য পাবো। অনেক ভালবাসা লেখাকে আর অজস্র ধন্যবাদ আলোকরেখাকে।

      ReplyDelete
    9. লেখক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর "পরীর দেশের রাজকুমার" খুব ভালো লাগলো। বিনম্র শ্রদ্ধা।

      ReplyDelete
    10. ছোটদের জন্য লেখা গল্পটা আপনাদের ভালো লেগেছে জেনে আমারো ভালো লাগলো. আপনাদের আশীর্বাদে ছোটরা আরো হাসতে শিখুক, সহজে জীবনকে বুঝতে শিখুক. আন্তরিক ধন্যবাদ সবাইকে আর আলোকরেখাকেও. আজকের দিনে, রুমির জন্মদিনে ওকে জানাচ্ছি আমার দোয়া আর অনেক শুভকামনা. রুমি আলোকরেখাকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাক এই আমার প্রার্থনা.

      ReplyDelete
    11. আপনি কিন্তু আমার কাছে ধরা পড়ে গেছেন ! আমি আপনাকে আমার তরুণ বয়স থেকে চিনি।  বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় থেকে চিনি ! আপনার আমাদের সবাইকে 'ভিটামিন সি' এর সর্বশ্রেষ্ট সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের 'আমলকী" কে পরিচয় করিয়ে দেবার কথা আমার মনে আছে ! এই "পরীর দেশে রাজকুমার" এর গল্পচ্ছলে আপনি চপল কুমার এর ছদ্মবেশে আপনার নিজের জীবনকাহিনী এবং আপনার অনুপ্রেরণা দাত্রী মায়ের কথা আমাদের জানিয়ে দিলেন এর জন্যে আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো ! আপনার অতীত ও বর্তমান দৈনন্দিনতার খবর ও ছবি দেখে আমার যে প্রশ্নটি মনের মধ্যে আকুপাকু করতো আজ তার জবাব পেয়ে গেলাম ! আপনি কেমন করে আপনার perpetual optimism বজায় রেখেছেন তার গোপন সূত্রটি আজ আপনি জানিয়ে দিলেন। আমার জানামতে আপনার কাছে আসা রোগীদের সবচেয়ে কম prescription drugs লেখা একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক এর খোলসে আপনিই যে চপল কুমার তা কিন্তু আমরা ধরে ফেলেছি এই "পরীর দেশে রাজকুমার" পড়ে ! এখন আমাদের কাছে জলের মত পরিষ্কার যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই চপল কুমার কাজ করে যাবে, স্বপ্ন দেখে যাবে এমন একটা পৃথিবীর জন্যে যার সাথে তুলনা চলে স্বপ্নে দেখা সেই "পরীর দেশ" এর !
      আপনাকে অনেক শ্রদ্ধা!   

      ReplyDelete
    12. Beautiful writing and illustration. What a gift for my child... thank you both writer and illustrator❤️

      ReplyDelete
    13. অসিন দত্তApril 2, 2020 at 8:38 PM

      খুব ভালো লাগলো চপল কুমারের গল্প পড়ে।

      ReplyDelete

    অনেক অনেক ধন্যবাদ